
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার এবং দ্বীপটির অস্তিত্ব রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে দ্বীপটিকে চারটি পৃথক জোনে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে একটি জোন পুরোপুরি ‘রেস্ট্রিক্টেড’ থাকবে। সেখানে কোনো পর্যটক বা সাধারণ মানুষের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের খসড়া মহাপরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা জানান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, সরকার এই মুহূর্তে সেন্ট মার্টিনের সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্যকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “সেন্ট মার্টিন ও পর্যটন ব্যবসা সমার্থক হতে পারে না। পর্যটন হবে, তবে তা হবে নিয়ন্ত্রিত এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক।”
তিনি বলেন, প্রায় ৮ হাজার মানুষের এই দ্বীপে প্রতিদিন যদি ১০ হাজার পর্যটক প্রবেশ করে, তাহলে তা স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও গোপনীয়তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দ্বীপটিতে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দ্বীপবাসীর বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়ে পরিবেশ উপদেষ্টা জানান, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। হস্তশিল্প, টেকসই মাছ ধরা এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনা—এসব খাতে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে জীবিকা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) সেন্ট মার্টিন দ্বীপের খসড়া মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছে। কর্মশালায় পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন সিইজিআইএসের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ এইচ এম নুরুল ইসলাম।
তিনি জানান, খসড়া মহাপরিকল্পনায় সেন্ট মার্টিনকে চারটি জোনে ভাগ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
জেনারেল ইউজ জোন: এখানে পর্যটনসহ সাধারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো যাবে। সব হোটেল ও রিসোর্ট এই জোনে সীমাবদ্ধ থাকবে।
ম্যানেজড রিসোর্স জোন: কচ্ছপের প্রজনন এলাকা হওয়ায় এখানে রাতে অবস্থান নিষিদ্ধ থাকবে। দিনে পর্যটকেরা প্রবেশ করতে পারবেন, তবে স্থানীয়রা প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করতে পারবেন না।
সাসটেইনেবল ইউজ জোন: লেগুন, ম্যানগ্রোভ ও ঝোপঝাড়সমৃদ্ধ এই এলাকায় স্থানীয়রা সরকার নির্ধারিত সীমার মধ্যে টেকসইভাবে সম্পদ ব্যবহার করতে পারবেন। পর্যটকদের রাতযাপন এখানেও নিষিদ্ধ।
রেস্ট্রিক্টেড জোন: জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে এই এলাকায় কারও প্রবেশের অনুমতি থাকবে না।
কর্মশালায় পরিবেশ সচিব ফারহিনা আহমেদ বলেন, সেন্ট মার্টিন প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠা একটি দ্বীপ। এর ক্ষতি করার অধিকার কারও নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, সাম্প্রতিক সফরে তিনি লক্ষ্য করেছেন, দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ধীরে ধীরে ফিরে আসছে।
ইউএনডিপির বাংলাদেশের ডেপুটি রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ সোনালী দায়ারত্নে জানান, সেন্ট মার্টিনের মতো জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ দ্বীপ সংরক্ষণে এই মহাপরিকল্পনায় সহযোগিতা দিতে পেরে সংস্থাটি আনন্দিত।