
বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জের নামে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নিচ্ছে একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। খুলনার খালিশপুরে ডিজেলভিত্তিক ২৩০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র গত দুই বছর ধরে এক ইউনিট বিদ্যুৎও উৎপাদন করেনি, অথচ প্রতিমাসে সরকারকে দিতে হচ্ছে সাড়ে ১৬ কোটি টাকার বেশি। একই চিত্র দেখা গেছে ঘোড়াশালের রিজেন্ট ১০৮ মেগাওয়াট কেন্দ্রসহ আরও বহু বিদ্যুৎকেন্দ্রে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিদ্যুৎ কেনায় ব্যয় করেছে ৬ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জেই পরিশোধ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মাধ্যমেই অতিরিক্ত প্রায় ১০০ কোটি ডলার বা ১২ হাজার কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপ্রয়োজনীয় স্থানে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং অপরিকল্পিতভাবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের ফলেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। সাবেক সরকারের আমলে বিশেষ আইনের আওতায় বেসরকারি আইপিপি কেন্দ্র অনুমোদনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা ছাড়াই চুক্তি দেওয়া হয়, যার সুযোগ নিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জের হার ইচ্ছামতো নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও শ্বেতপত্র কমিটির সদস্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেছেন, যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের সক্ষমতার ৪০ শতাংশের কম উৎপাদন করে, সেগুলোর প্রয়োজনই নেই। তবুও এসব কেন্দ্র বসিয়ে বসিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে অর্থ দেওয়া হয়েছে, যা কার্যত প্রকাশ্য লুটপাট।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যার মোট সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ৬৯টি বেসরকারি আইপিপি এবং ৫৪টি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র। কয়লাভিত্তিক বড় কেন্দ্র চালু হওয়ার পর এসব তেলভিত্তিক কেন্দ্রের প্রয়োজন কমে গেলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সরকারকে নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, খালিশপুর, মধুমতি, রিজেন্ট ঘোড়াশাল, সামিট বরিশাল, ওরিয়ন মেঘনাঘাট, ইউনাইটেড পায়রা ও আনোয়ারা—এমন বহু কেন্দ্র উৎপাদন সক্ষমতার ১০ শতাংশেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করলেও মাসে কোটি কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ নিচ্ছে। কোনো কোনো কেন্দ্র পাঁচ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা বিল নিয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ প্যারামাউন্ড-বাংলাট্রেক ২০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র। পাঁচ বছরে মাত্র ৩১ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও বিল নিয়েছে ২ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকার বেশি। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম দাঁড়ায় ৮৫ টাকারও বেশি, যেখানে পিডিবি গড়ে বিদ্যুৎ বিক্রি করে মাত্র সাড়ে ৬ টাকায়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবীর খান জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ খাতে অনিয়মের যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ সরকারের হাতে রয়েছে এবং একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি আইপিপিগুলোকে বিদ্যুৎ বিক্রির দাম কমানোর নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পর্যালোচনা কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে, সাবেক সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও কিছু কর্মকর্তা বিশেষ আইনের সুযোগ নিয়ে বিদ্যুৎ খাতে অনিয়মের পথ খুলে দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেখিয়ে একের পর এক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২০–২১ সালে যেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ছিল ৬ টাকার কিছু বেশি, সেখানে ২০২৩–২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ১১ টাকার ওপরে।
সব মিলিয়ে, ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিদ্যুৎ খাতে যে অনিয়ম ও আর্থিক অপচয় হয়েছে, তা শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের লাভ বাড়ালেও দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর ফেলেছে গভীর চাপ। এই সংকট থেকে উত্তরণে চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।