
স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডটি ছিল একটি পূর্বপরিকল্পিত ‘কিলিং মিশন’—এমনটাই প্রাথমিক তদন্তে জানিয়েছে পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এই হত্যায় মোট পাঁচজন অংশ নেয় এবং তাদের মধ্যে তিনজন সরাসরি গুলি চালায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন জানান, যারা মুছাব্বিরকে গুলি করেছে তারা তার পরিচিত ছিলেন। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, হামলাকারীরা পেশাদার ও ভাড়াটে শ্যুটার এবং তারা কেউই স্থানীয় নন।
ঘটনাটি ঘটে গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ৮টার দিকে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে স্টার হোটেলের পাশের একটি গলিতে মুছাব্বিরকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে দ্রুত পান্থপথের বিআরবি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। একই ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা তেজগাঁও থানা ভ্যানশ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান ব্যাপারী মাসুদ গুলিবিদ্ধ হন। তিনি বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন।
সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুছাব্বিরের পেটের ডান পাশে আধা ইঞ্চি আকারের গুলির ছিদ্র, ডান হাতের কনুইয়ের পেছনে আরেকটি ছিদ্র এবং বাম পায়ের হাঁটুতে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। পুলিশের ধারণা, গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যাওয়ার সময় হাঁটুতে আঘাত পান তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শী মন্টু জানান, গুলির শব্দ শোনার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মুছাব্বির দৌড়ানোর চেষ্টা করেন এবং তখন বলেন, ‘তোরা করলিডা কি আমারে?’। কিছুদূর এগিয়ে একটি মুদি দোকানের সামনে পড়ে যান তিনি। পরে তাকে ধরে চিকিৎসার জন্য নেওয়ার কথা বললেও আর কথা বলতে পারেননি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান জানিয়েছেন, কারওয়ান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজি, ফার্মগেট এলাকায় গ্যারেজ দখল এবং স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব—এই বিষয়গুলো সামনে রেখে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, হত্যার পেছনে মূলত দুটি মোটিভ কাজ করেছে—স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ এবং কারওয়ান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ওই এলাকায় বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের স্থানীয় নেতাদের মধ্যে দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনাও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, গলির ভেতরে তিনজন অস্ত্রধারী সরাসরি গুলি চালায়। একই সময় স্টার হোটেলের সামনে মূল সড়কে আরও দুজন অবস্থান নিয়ে মুছাব্বিরের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল।
ঘটনার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ২৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আব্দুল মজিদ মিলন ও যুবদলের সহসভাপতি মো. ফারুক হোসেনকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মিলনকে ছেড়ে দেওয়া হলেও ফারুককে এখনো আটক রাখা হয়েছে। র্যাব দুজনকে এবং তেজগাঁও থানা পুলিশ আরও তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া তেজগাঁও থানা যুবদলের বহিষ্কৃত সদস্যসচিব আবদুর রহমানকে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় খুঁজছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকেই তিনি ও তার অনুসারীরা পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিসিটিভি ফুটেজ, জিজ্ঞাসাবাদ ও অন্যান্য আলামতের ভিত্তিতে খুব শিগগিরই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।