
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিক প্রার্থীদের ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ে ৭২৩ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল ও স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৬০০ জন প্রার্থী প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করেছেন, যার শুনানি শুরু হয়েছে এবং তা চলবে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবারের জাতীয় নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসের ‘সর্বকালের সেরা নির্বাচন’ হিসেবে উল্লেখ করলেও নির্বাচন কমিশন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অন্য বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, ১১৩ জন ঋণখেলাপি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে ৩১ জন উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে প্রার্থী হিসেবে বৈধতা পেয়েছেন, যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর তালিকায় তারা ঋণখেলাপি হিসেবেই চিহ্নিত।
নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, কোনো ঋণখেলাপি ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। এমনকি নির্বাচিত হওয়ার পরও কারো ঋণখেলাপির তথ্য প্রমাণিত হলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করার ক্ষমতা রয়েছে কমিশনের। তবে উচ্চ আদালতের আদেশের কারণে কমিশন সরাসরি কিছু প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারছে না—যা নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ে শুধু ঋণখেলাপির কারণেই ৮২ জন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। এদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাড়াও বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদ, জেএসডি, এলডিপি, কমিউনিস্ট পার্টি ও বাংলাদেশ লেবার পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা রয়েছেন। একই সঙ্গে কয়েকজন দ্বৈত নাগরিক প্রার্থীর মনোনয়নও বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে।
সংবিধানের ৬৬ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জন্মসূত্রে বাংলাদেশি নাগরিক হয়ে বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণকারীরা নির্বাচনে অযোগ্য। তবে কেউ বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন—এমন হলফনামা দিলে তার মনোনয়ন গ্রহণ বা স্থগিত রাখা হয়েছে। ফলে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েও নির্বাচনে অংশগ্রহণের চেষ্টা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের সংসদে যাওয়ার চেষ্টা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক। তারা মনে করেন, যারা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করেননি বা যারা একসময় দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন, তাদের পক্ষে সংসদে গিয়ে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেছেন, ঋণখেলাপি ও অর্থনৈতিক অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে কঠোর হতে হবে। আরপিওতে কমিশনকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমেই জনমনের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে আপিল নিষ্পত্তি, প্রার্থিতা প্রত্যাহার, প্রতীক বরাদ্দ ও প্রচারণার নির্ধারিত সময়সূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশনের আইন প্রয়োগের সক্ষমতা এবং নিরপেক্ষতা জনগণের সামনে স্পষ্ট হবে।
এই নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি হবে নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি বড় পরীক্ষা।