
রাজধানী ঢাকায় গত কয়েক দিন ধরে পাইপলাইনের গ্যাসে ভয়াবহ স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় আগুন জ্বলছে না, কোথাও আবার অল্প আঁচে টিমটিম করে জ্বলেও রান্না করতে স্বাভাবিক সময়ের দ্বিগুণ সময় লাগছে। এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ গৃহস্থালি গ্রাহকরা।
গোপীবাগ এলাকার বাসিন্দা অর্চনা রায়ের অভিজ্ঞতাই এ সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। টানা তিন দিন তার বাসায় গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে তিনি ইনডাকশন কুকার কিনেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খাবারের অস্বাভাবিক মেনু তুলে ধরে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যে তিনি লেখেন—রাইস কুকার, ইলেকট্রিক চুলা আর কেটলিই এখন রান্নাঘরের ভরসা।
এই চিত্র শুধু গোপীবাগেই সীমাবদ্ধ নয়। বেগুনবাড়ি, ধানমন্ডি, বনশ্রী, মোহাম্মদপুর, রামপুরা, মগবাজারসহ রাজধানীর প্রায় সব এলাকায় একই অবস্থা। বেগুনবাড়ির গৃহকর্মী সালমা আক্তার জানান, ভোর থেকে রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। অনেক সময় গভীর রাতে সামান্য গ্যাস এলে তখনই রান্না সেরে নিতে হয়।
ধানমন্ডির চাকরিজীবী রাশেদ মাহমুদ বলেন, সন্ধ্যার পর চুলায় আগুন পাওয়া যায় না। গভীর রাতে গ্যাস এলেও তা দিয়ে স্বাভাবিক রান্না সম্ভব হয় না। বনশ্রীর নাহিদ হাসান জানান, ভোরে কিছুক্ষণ গ্যাস পেয়ে সকালের রান্না শেষ করতে হয়, দিনের বেলা খাবার বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, এ সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া, শীতের কারণে পাইপলাইনে গ্যাস জমে যাওয়া এবং সম্প্রতি আমিনবাজার এলাকায় তুরাগ নদীর তলদেশে বিতরণ পাইপলাইনের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। মেরামতের সময় পাইপে পানি ঢুকে পড়ায় অনেক এলাকায় প্রথমে পানি, পরে গ্যাস বের হচ্ছে। মোহাম্মদপুর এলাকায় এই সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে তিনি জানান, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিকের দিকে যাচ্ছে।
লাইন গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার এলপিজির দিকে ঝুঁকলেও সেখানে চলছে ভয়াবহ সংকট। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, আদাবর এলাকায় ঘুরেও অনেকেই সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। আগারগাঁও এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে ২,৩০০ টাকায়, যেখানে সরকার নির্ধারিত দাম ১,৩০৬ টাকা।
ঢাকার বাইরেও পরিস্থিতি একই। গাজীপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, হবিগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে সিলিন্ডারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কোথাও দোকান বন্ধ রেখে গোপনে বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।
গ্যাস সংকটের সুযোগে হঠাৎ বেড়েছে বৈদ্যুতিক চুলার বিক্রি। মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও শ্যামলীর একাধিক দোকানে চুলার মজুত শেষ। বিক্রেতারা জানান, বিক্রি অন্তত ৩০ শতাংশ বেড়েছে। দাম সাড়ে তিন হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় গাড়িচালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। অনেক সময় অর্ধেক গ্যাস নিয়েই ফিরে যেতে হচ্ছে। মালিবাগ এলাকার অটোরিকশাচালক জসিম উদ্দিন বলেন, এতে আয় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪১০ কোটি ঘনফুট, অথচ সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৫০ থেকে ২৬০ কোটি ঘনফুট। এই ঘাটতির প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে পড়ছে ঘর থেকে সড়ক—সবখানেই।