
বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে সংকোচন অব্যাহত থাকলেও ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ছয় মাসের ব্যবধানে এসব ব্যাংকের নিট মুনাফা ৯২৩ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ৩ হাজার ৭৩৮ কোটির বেশি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম: প্রবণতা ও পরিচালনাগত পর্যবেক্ষণ (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ছিল ২ হাজার ৮১৫ কোটির কিছু বেশি, যা ডিসেম্বর শেষে বেড়ে ৩ হাজার ৭৩৮ কোটিরও বেশি হয়েছে।
অন্যদিকে, একই সময়ে মোট আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা, যা আগের ছয় মাসের তুলনায় ৭৭ কোটি টাকার বেশি। তবে দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানতের বাজার অংশীদারি ৪.৬ শতাংশ থেকে কমে ৪.২ শতাংশে নেমে এসেছে।
ঋণ বিতরণে দেখা গেছে বিপরীত চিত্র। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ছিল ৫১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা, যা এক বছর পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে কমে ৪৬ হাজার ১২২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বছরে প্রায় ৫ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা বা ১১.৩ শতাংশ ঋণ কমেছে। শুধু জুলাই থেকে ডিসেম্বর—এই ছয় মাসেই ঋণ বিতরণ কমেছে ২ হাজার ২৩২ কোটির বেশি।
ফলে দেশের মোট ব্যাংক ঋণের মধ্যে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশও ৩.১ শতাংশ থেকে কমে ২.৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিল্প খাত বিদেশি ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বড় ঋণগ্রহীতা। মোট ঋণের ৫২ শতাংশ শিল্প খাতে, ২০ শতাংশ ব্যবসা ও বাণিজ্যে, ১৬ শতাংশ ভোক্তা ঋণে এবং অবশিষ্ট অংশ অন্যান্য খাতে বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শিল্প খাতে ঋণ কিছুটা বাড়লেও ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বৈদেশিক বাণিজ্য অর্থায়নে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অবস্থান এখনো শক্তিশালী। ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে ৪.১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় দেশে এসেছে, যা ওই সময়ের মোট রপ্তানি আয়ের ১৮.৮ শতাংশ। একই সময়ে ৪.২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানি বিল পরিশোধ হয়েছে, যা মোট আমদানির ১৩.১ শতাংশের সমান।
তবে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) সংগ্রহে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট রেমিট্যান্সের মাত্র ০.৩ শতাংশ এসব ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে।
আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকেও বিদেশি ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তাদের মূলধন পর্যাপ্ততার হার নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার চেয়ে বেশি, তারল্য পরিস্থিতি শক্তিশালী এবং খেলাপি ঋণের হারও তুলনামূলক কম, যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় তাদের সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, মুনাফা ও বৈদেশিক বাণিজ্য অর্থায়নে ইতিবাচক অবস্থান ধরে রাখলেও ঋণ বিতরণে ধারাবাহিক পতন এবং বাজার অংশীদারি সংকুচিত হওয়া বিদেশি ব্যাংকগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের বিষয়।