
লিবিয়ার ভয়াবহ মানবপাচার চক্র, নির্যাতন, মুক্তিপণ এবং ভূমধ্যসাগরের প্রাণঘাতী যাত্রার ঝুঁকি সম্পর্কে জানার পরও থামছে না ইউরোপমুখী অনিয়মিত অভিবাসন। বরং ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি ও গ্রিসে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এবারও বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। মানবপাচারের এই উদ্বেগজনক বাস্তবতা সামনে রেখেই বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য— ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’।
জাতিসংঘ ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ৩০ জুলাইকে আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এ উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ও গবেষণায় উঠে এসেছে, লিবিয়া হয়ে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ পথে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ আশঙ্কাজনকভাবে বেশি।
ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্যের বরাত দিয়ে ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। এছাড়া ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইতালিতে ৪ হাজার ২৪৯ জন এবং একই সময়ে গ্রিসে ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করেছেন। গ্রিসগামী এই সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে।
এই যাত্রাপথে মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনাও বাড়ছে। চলতি বছরের মার্চে লিবিয়ার তোবরুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া একটি নৌকা ছয় দিন সাগরে দিক হারিয়ে ভেসে থাকার পর অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা ছিলেন। খাদ্য ও পানির অভাবে মৃত্যুর পর পাচারকারীদের নির্দেশে মরদেহ সাগরে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও উঠে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লিবিয়ার বিভিন্ন পাচারকারী চক্র বাংলাদেশিদের জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। বন্দিশিবিরে শারীরিক নির্যাতন, অমানবিক জীবনযাপন এবং মুক্তিপণের ঘটনা নিয়মিত ঘটলেও ইউরোপে উন্নত জীবনের আশায় অনেক তরুণ এখনো এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছেন।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম জানায়, এই পথে যাওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ দেশের অন্তত ১০ থেকে ১২টি জেলার মানুষ দালালচক্রের প্রলোভনে বেশি ঝুঁকছেন। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ, মানবপাচারের নতুন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মানবপাচার আইনে ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। পুরোনো মামলাসহ ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা বিচার ও তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা বিচারাধীন এবং ১ হাজার ৯৭৮টি মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
এদিকে অনিয়মিত অভিবাসনের পাশাপাশি নতুন সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে সাইবার স্ক্যাম বা অনলাইন প্রতারণা চক্র। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চাকরির প্রলোভনে নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশিদের জোরপূর্বক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে নেওয়া ব্যক্তিদের ৯৮ শতাংশই প্রকৃত কোনো চাকরি পাননি। বরং ৯০ শতাংশকে বিভিন্ন ধরনের সাইবার জালিয়াতিতে বাধ্য করা হয়েছে। এতে রাজি না হলে অনেকেই শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
মানবাধিকারকর্মী ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবপাচার প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সচেতনতা বৃদ্ধি, বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।