
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধ দমনে চলছে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ–২’। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে বাস্তবে তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরছে না। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও খুন, গুলি কিংবা বোমার শব্দে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে অস্ত্রের ঝনঝনানি, যা নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
গত ১১ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তপশিল ঘোষণা করে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু তপশিল ঘোষণার পরদিনই রাজধানীতে ফিল্মি কায়দায় গুলি করে হত্যা করা হয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে। সেই ঘটনার এক মাস না পেরোতেই গত বুধবার রাতে রাজধানীতে আবারও গুলি করে হত্যা করা হয় জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে।
এই দুই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও একাধিক গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে। নতুন বছর শুরুর পর গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অন্তত নয়টি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গত সোমবার মাত্র পাঁচ ঘণ্টার ব্যবধানে যশোরের মনিরামপুরে এক ব্যবসায়ী, চট্টগ্রামের রাউজানের সিকদারপাড়ায় এক যুবদল নেতা এবং নরসিংদীতে আরেক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়াতে ফাঁকা গুলি ছোড়ার ঘটনাও ঘটছে। রাজবাড়ীতে জামিনে মুক্তি পাওয়া এক চিহ্নিত সন্ত্রাসী কারাগারের সামনেই গুলি ছুড়ে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। গত ১৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে ছাত্রদলের সাবেক এক নেতার বাড়ি লক্ষ্য করে ১৫ থেকে ২০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার দুপুরে গাজীপুরে এনসিপির এক কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। তিনি প্রাণে বাঁচলেও দুর্বৃত্তরা তার মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে যে ধরনের নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রয়োজন, সেখানে দৃশ্যমান ঘাটতি রয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে ভোটের মাঠেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সব হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক নয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বেশিরভাগ ঘটনা চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গত ২৬ দিনে দুই শতাধিক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার এবং ১৫ হাজারের বেশি অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পুলিশের প্রায় ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র ও ৬ লাখের বেশি গোলাবারুদ লুট হয়। দেড় বছরে চার হাজারের বেশি অস্ত্র উদ্ধার হলেও এখনো প্রায় দেড় হাজার অস্ত্র এবং দুই লাখের বেশি গুলি বেহাত রয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ অস্ত্র ও জামিনে মুক্ত অপরাধীদের পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, “নির্বাচনের মতো বড় রাজনৈতিক আয়োজনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আস্থার জায়গায় নেওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”
পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন্স বিভাগের উপমহাপরিদর্শক মো. রেজাউল করিম বলেন, পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করছে এবং নির্বাচনের আগে আরও অস্ত্র উদ্ধার হবে বলে তারা আশাবাদী।