
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল আলোচিত সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত গণভোট। এই গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে স্পষ্ট মেরুকরণ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। জামায়াতে ইসলামী, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টিসহ (এনসিপি) মোট ১১টি রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে।
দলগুলো জানিয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সমাবেশ, পথসভা ও গণসংযোগের মাধ্যমে সংস্কারের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা হবে। তাদের দাবি, এই গণভোট কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়; বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
সরকার ইতোমধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান স্পষ্ট করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ একাধিক উপদেষ্টা প্রকাশ্যে সংস্কারের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরাও বিভিন্ন সভা-সেমিনারে প্রস্তাবিত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন।
‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর আওতায় এই গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে—প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন জোরদার, প্রশাসনে দলীয়করণ হ্রাস এবং মৌলিক অধিকার ও ভোটাধিকার সুরক্ষা।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা বা একক ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
১১ দলের সমন্বিত কৌশলের অংশ হিসেবে গত ৮ ডিসেম্বর জামায়াতসহ কয়েকটি দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে দেশব্যাপী ‘হ্যাঁ’ প্রচারণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে এনসিপিসহ আরও কয়েকটি দল যুক্ত হয়ে জোটটি ১১ দলে রূপ নেয়। জামায়াতের শীর্ষ নেতারা একে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ ও রাজনৈতিক দলীয়করণের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘স্বৈরাচারকে না, গণভোটে হ্যাঁ’ বলার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে বিএনপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’—কোনো পক্ষেই স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। দলটির নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, গণভোটের প্রস্তাবনা রাজনৈতিকভাবে একতরফা হতে পারে। তাদের প্রধান মনোযোগ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট হওয়ায় ভোটার আচরণে দ্বিমুখী প্রভাব পড়তে পারে। কেউ গণভোটকে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে রাজনৈতিক কৌশল বলেও বিবেচনা করছেন।
সব মিলিয়ে, এই গণভোট শুধু সংস্কার প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রদর্শন, ক্ষমতার কাঠামো এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।