
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের পশ্চিমতীরে ইসরাইলের দীর্ঘদিনের বৈষম্যমূলক নীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মানবাধিকার কার্যালয় প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের পদ্ধতিগত বৈষম্য এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ‘বর্ণবৈষম্য’-এর সঙ্গে তুলনীয়।
বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে জাতিসংঘ জানায়, পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র ইসরাইলের বৈষম্যমূলক আইন, নীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। পানি সরবরাহ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, চলাচলের স্বাধীনতা এমনকি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করাও নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়ছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক এক বিবৃতিতে বলেন, পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের মৌলিক অধিকার ‘পদ্ধতিগতভাবে শ্বাসরুদ্ধ’ করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “এটি একটি গুরুতর ধরনের জাতিগত বৈষম্য ও বিভাজন, যার সঙ্গে অতীতের বর্ণবৈষম্যমূলক ব্যবস্থার স্পষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে।”
জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট একাধিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ আগেও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের পরিস্থিতিকে ‘বর্ণবৈষম্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এই প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান নিজেই প্রকাশ্যে এই শব্দটি ব্যবহার করলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী ও ফিলিস্তিনিদের জন্য আলাদা আইন ও নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর ফলে ভূমি মালিকানা, চলাচল, নিরাপত্তা এবং বিচারিক প্রক্রিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ফিলিস্তিনিরা অসম ও বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হচ্ছেন।
ফিলিস্তিনিদের জমি ও সম্পদ থেকে বঞ্চিত করে উচ্ছেদ করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে বিচার চালানো হচ্ছে, যেখানে ন্যায্য বিচার ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অধিকার নিয়মিতভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।
ভলকার তুর্ক ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জাতি, ধর্ম কিংবা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বৈষম্য বজায় রাখে—এমন সব আইন, নীতি ও কার্যক্রম অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় আরও জানায়, পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রে এই সহিংসতা ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর সম্মতি, সমর্থন কিংবা প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে ঘটছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
১৯৬৭ সাল থেকে অধিকৃত পশ্চিমতীরে বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করছেন। একই ভূখণ্ডে পাঁচ লক্ষাধিক ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে এএফপির হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিমতীরে ইসরাইলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে বহু সাধারণ নাগরিক রয়েছেন। অন্যদিকে ইসরাইলের সরকারি তথ্যমতে, একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের হামলায় অন্তত ৪৪ জন ইসরাইলি সেনা ও সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন পশ্চিমতীরের মানবাধিকার সংকটকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।