
রাজধানীর পল্লবী থানাকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর এক অভিযোগ সামনে এসেছে, যেখানে প্রতারক চক্রের সঙ্গে পুলিশের যোগসাজশে ভুক্তভোগীদেরই উল্টো আটক করার অভিযোগ উঠেছে। কোটি টাকার প্রতারণা, মিথ্যা মামলা এবং পুলিশি হয়রানির এই ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিভিন্ন মহলে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন আহসান হাবিব নামে এক ব্যক্তি। তিনি সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে খাদ্যপণ্য সরবরাহের ব্যবসার কথা বলে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেন। অভিযোগ রয়েছে, কারও কাছ থেকে এক কোটি টাকা নিতে পারলেই তিনি প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করেন পুলিশ ও আইনজীবীদের পেছনে, যাতে ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধেই মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা যায়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতারণার শিকার হওয়ার পর তারা টাকা ফেরত চাইলে উল্টো তাদের বিরুদ্ধে অপহরণসহ বিভিন্ন মিথ্যা মামলা করা হয়। এরপর পুলিশের সহায়তায় তাদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।
দৈনিক যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবার বিকেলে আহসান হাবিব ভুক্তভোগীদের টাকা পরিশোধের আশ্বাস দিয়ে রাজধানীর ইসিবি চত্বরে ডেকে নেন। সেখানে পরিকল্পিতভাবে পল্লবী থানার পুলিশের একটি দল হাজির হয়ে কয়েকজন ভুক্তভোগীকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
সূত্র জানায়, এসআই সাইফুলের নেতৃত্বে পুলিশের ওই দল কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই তাদের আটক করে। এ সময় ভুক্তভোগীরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালেও রাত ১২টা পর্যন্ত তাদের থানায় আটকে রাখা হয়।
এ বিষয়ে পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির বলেন, তিনি বুঝতে পারছেন আটক ব্যক্তিরা প্রতারণার শিকার হয়েছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে করা মামলাটি সঠিক নয়। তবুও মামলা থাকায় তাদের গ্রেপ্তার দেখাতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান তিনি। তবে মিথ্যা মামলা হলে তদন্ত ছাড়া গ্রেপ্তার করা যায় কি না—এ প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি।
ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মো. মোস্তাক সরকার জানিয়েছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং বিস্তারিত জানার জন্য তিনি পল্লবী থানায় যাচ্ছেন।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের একজন রোমেলকে ফোন করে আহসান হাবিবের স্ত্রী টাকা ফেরতের আশ্বাস দেন এবং ইসিবি চত্বরে দেখা করতে বলেন। সেখানে পৌঁছানোর পর বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয়। একপর্যায়ে পুলিশ এসে তাদের আটক করে।
অভিযোগ রয়েছে, এই ঘটনার আগে পল্লবী থানার ভেতরেই আহসান হাবিবকে নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। মাত্র দুই মাস আগে ওই থানায় দায়িত্ব নেওয়া ওসির বিরুদ্ধে এর মধ্যেই নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, তারা ইতোমধ্যে আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছেন, যার মধ্যে একটি মামলায় চার্জশিটও দাখিল হয়েছে। অথচ তাদের বিরুদ্ধেই নতুন করে অপহরণ মামলা করা হয়েছে, যেখানে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল না।
সূত্র মতে, আহসান হাবিব প্রায় ১৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এবং অন্তত আটজন ভুক্তভোগীকে একইভাবে হয়রানি করছেন। তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে এবং কয়েকটিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, এক সপ্তাহ আগে ভুক্তভোগীরা তাকে মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে ধরে থানায় নিয়ে গেলে পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করে। পরে সেই সুযোগে আহসান হাবিব গোপনে ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে মামলা করে এই হয়রানির পথ বেছে নেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশকে এফআইআর গ্রহণের আগে প্রাথমিক তদন্ত করা উচিত। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, অভিযোগ সত্য কি না তা যাচাই না করে কাউকে গ্রেপ্তার করা আইনসম্মত নয়।
পুরো ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ভুক্তভোগীরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।