
সৌদি আরবে শ্রমিক ভিসায় পাড়ি জমানো বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশ এখন চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশ থেকে সৌদিগামী শ্রমিকদের প্রায় ৯০ শতাংশই আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে সংগৃহীত ‘কফিল ভিসায়’ দেশটিতে যাচ্ছেন। এসব ভিসায় যাওয়া কর্মীদের বড় অংশ সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর কাজ না পাওয়া, অনিয়মিত বেতন কিংবা একেবারেই বেতন না পাওয়ার অভিযোগ করছেন।
অনেকে কয়েক মাস টিকে থাকার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত খালি হাতে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। দেশে ফিরে তারা রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক এবং গ্রামে থাকা দালালদের বিরুদ্ধে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে (বিএমইটি) অভিযোগ দায়ের করছেন। কেউ কেউ অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় উদ্ধারে থানায়ও অভিযোগ করছেন।
বিএমইটির অভিযোগ সেল থেকে যেসব অভিযোগ তদন্তের পরও নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না, সেগুলো সুপারিশসহ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট সেলে পাঠানো হচ্ছে। সেলটির প্রধান যুগ্মসচিব এ জেড এম নুরুল হক জানান, সর্বোচ্চ ৬০ কার্যদিবসের মধ্যেই এসব অভিযোগের নিষ্পত্তি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এক সপ্তাহের মধ্যেই সমাধান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির বিরুদ্ধে জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল বা সার্ভার লক করার মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনই সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতারিত শ্রমিকরা দেশে ফিরছেন। মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত শুধু সৌদি আরব থেকেই ৩৬ জন পুরুষ কর্মী দেশে ফেরত এসেছেন। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কাতার ও ওমান থেকেও একাধিক শ্রমিক ফিরেছেন। এর আগে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে সৌদি, রাশিয়া, মালয়েশিয়া ও অন্যান্য দেশ থেকে জেলফেরত ও আউটপাসে আসা বহু কর্মী দেশে ফেরেন।
দেশে ফিরে আসা অনেক কর্মী আকামা জটিলতা, কোম্পানি পরিবর্তন কিংবা কাজের সন্ধানে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যাওয়ার কারণে সৌদি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে জেল খেটেছেন বলেও জানা গেছে।
ঢাকার কাকরাইল এলাকার এক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক জানান, বর্তমানে সৌদি আরবে যাওয়া শ্রমিকদের প্রায় অর্ধেক ভালো অবস্থায় আছেন। তবে বাকি অর্ধেকের মধ্যে ৩০ শতাংশ নানা সমস্যার মধ্যেও টিকে থাকার চেষ্টা করছেন এবং প্রায় ২০ শতাংশ কর্মী উপায় না পেয়ে দেশে ফিরে আসছেন। তিনি বলেন, সমস্যায় পড়া শ্রমিকদের ৯০ শতাংশই কফিল ভিসায় গেছেন।
তিনি আরও বলেন, কফিল ভিসায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো কেবল সরকারি খরচসহ সীমিত সার্ভিস চার্জ নেয়। কিন্তু দেশে ফিরে অভিযোগ হলে এজেন্সির লাইসেন্সের নামেই অভিযোগ দেওয়া হয়। এতে অনেক সময় অন্যায় না করেও এজেন্সিগুলোকে সরকার নির্ধারিত ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে বাধ্য হতে হয়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদির মালিকরা দুই-তিন হাজার রিয়াল খরচ করে কফিল ভিসা সংগ্রহ করলেও বাস্তবে এসব ভিসার বিপরীতে নির্দিষ্ট কাজ থাকে না। তিন মাসের আকামার মেয়াদ শেষ হলেই কর্মীরা বিপদে পড়েন। ফলে প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএমইটির ওয়ানস্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে এবং কোম্পানি ভিসায় কর্মী পাঠানো হলে প্রতারণার ঝুঁকি অনেক কমে আসবে। কফিল ভিসার ওপর নির্ভরতা কমানো না গেলে সৌদি শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।