
চুল মানুষের সৌন্দর্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। অল্প বয়সে রোগ, হরমোনজনিত সমস্যা, দুর্ঘটনা বা অন্যান্য চিকিৎসাগত কারণে চুল পড়ে গেলে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বর্তমানে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট, লেজার থেরাপি এবং অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে নতুন করে চুল গজানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—এসব চিকিৎসা গ্রহণ ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ কি না।
কোরআন-সুন্নাহ এবং সমকালীন ইসলামী গবেষকদের মতামত অনুযায়ী, রোগ বা শারীরিক ত্রুটি দূর করার উদ্দেশ্যে বৈধ চিকিৎসার মাধ্যমে চুল গজানো শরিয়তসম্মত। তবে চিকিৎসা পদ্ধতিতে হারাম উপাদান বা শরিয়তবিরোধী কোনো কাজ থাকা যাবে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। কারণ আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার চিকিৎসাও তিনি সৃষ্টি করেননি।” (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৫৫; জামে তিরমিজি: ২০৩৮)
আল্লাহ তাআলা বলেন, “তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের ব্যাপারে কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি।” (সুরা হজ: ৭৮)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তিনি তোমাদের জন্য কঠোরতা চান না।” (সুরা বাকারা: ১৮৫)
সহিহ বুখারিতে বর্ণিত বনি ইসরাঈলের তিন ব্যক্তির ঘটনায় দেখা যায়, এক টাকমাথা ব্যক্তি সুন্দর চুলের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলে আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতা তাকে স্পর্শ করেন এবং তার টাক দূর হয়ে সুন্দর চুল গজিয়ে যায়। (সহিহ বুখারি: ৩৪৬৪)
ইসলামী গবেষকদের মতে, এ হাদিস থেকে বোঝা যায় যে শারীরিক ত্রুটি দূর করে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা বৈধ। তাই হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট বা অনুরূপ চিকিৎসাকে আল্লাহর সৃষ্টিতে নিষিদ্ধ পরিবর্তন হিসেবে গণ্য করা হয় না; বরং এটি চিকিৎসার অংশ।
সমকালীন সৌদি আলেম ড. সাদ বিন তুর্কি আল-খাতলানও মত দিয়েছেন যে, চুল প্রতিস্থাপন বা চিকিৎসার মাধ্যমে নতুন চুল গজানো আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন নয়। এটি হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার বৈধ প্রচেষ্টা।
তবে এ ধরনের চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত মানার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আলেমরা। উদ্দেশ্য হতে হবে রোগ বা শারীরিক ত্রুটি দূর করা, অহংকার বা প্রতারণা নয়। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নিরাপদভাবে সম্পন্ন হতে হবে। এছাড়া হারাম উপাদান বা শরিয়তবিরোধী কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে না এবং চিকিৎসার মাধ্যমে কাউকে প্রতারণা করার উদ্দেশ্যও থাকা যাবে না।
সার্বিকভাবে ইসলামী দৃষ্টিতে, অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা চিকিৎসাগত কারণে চুল পড়ে গেলে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট, লেজার থেরাপি বা অনুরূপ বৈধ চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা জায়েজ। কারণ এটি সৌন্দর্যের জন্য নিষিদ্ধ পরিবর্তন নয়; বরং একটি শারীরিক ত্রুটির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অংশ।