
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত তিন হাজার ২৪১ জন জুলাইযোদ্ধার পুনর্বাসনের জন্য তথ্যভান্ডার তৈরি করেছে সরকার। তবে এ পর্যন্ত মাত্র ১৫০ পরিবারের জীবিকার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, আহতদের চিকিৎসা, মাসিক ভাতা, এককালীন অনুদান এবং বিদেশে উন্নত চিকিৎসাসহ বিভিন্ন খাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯৭৩ কোটি ৩৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তবে আহতদের অভিযোগ, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় সরকারি সহায়তা এখনও অপ্রতুল। তাদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান এবং মানসিক সহায়তা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাইযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ধীরগতিতে এগোয়। পরে শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের কল্যাণে পৃথক অধিদপ্তর গঠন করা হয় এবং মাঠপর্যায়ে পুনর্বাসন কার্যক্রমের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সরকারি তথ্যমতে, পুনর্বাসনের জন্য প্রস্তুত করা তিন হাজার ২৪১ জনের তথ্যভান্ডারের মধ্যে এক হাজার ৯৩৭ জনের তালিকা প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ছয় হাজার ৪০০ জন আর্থিক সহায়তা পেলেও জীবিকার ব্যবস্থা হয়েছে মাত্র ১৫০টি পরিবারের।
বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য বলছে, বর্তমানে প্রায় চার হাজার আহত ব্যক্তি নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার রোগী নিয়মিত ঢাকায় এসে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। অন্তত দুই হাজার ব্যক্তি স্থায়ীভাবে অঙ্গ বা কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন।
বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো ১৫৪ জনের মধ্যে এখনও ৩৯ জন থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দেশে ফিরে আসা আহতদের মধ্যে ২৫ জন এখনও শয্যাশায়ী। তাদের সাতজন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন। থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীনদের মধ্যে অন্তত ১০ জন এখনও বিছানা থেকে উঠতে পারেন না।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবর বলেন, দুই হাজারের বেশি আহত ব্যক্তি স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরা কঠিন। তিনি জানান, এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান এবং মানসিক ট্রমা মোকাবিলার কার্যকর ব্যবস্থা।
তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফাউন্ডেশন ৮৩১টি শহীদ পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা করে সহায়তা দিয়েছে। এছাড়া আহত ছয় হাজার ১২৭ জনকে বিভিন্ন ক্যাটেগরিতে মোট ১১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার জরুরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. মো. আবুল কেনান বলেন, গুরুতর আহতদের অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন। বিশেষ করে যাদের কৃত্রিম অঙ্গ ব্যবহার করতে হচ্ছে, তাদের বয়স ও শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন অঙ্গ প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা জানান, চোখে ছররা গুলিতে আহত প্রায় এক হাজার ব্যক্তি চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১ জন দুই চোখের এবং ৪৯৩ জন এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। এছাড়া অনেকের আংশিক দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়েছে এবং তাদের নিয়মিত ফলোআপ প্রয়োজন।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুলাই গণঅভ্যুত্থান শাখার উপসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম জানান, আহতদের চিকিৎসা, মাসিক ভাতা, এককালীন অনুদান এবং বিদেশে চিকিৎসাসহ বিভিন্ন খাতে এ পর্যন্ত ৯৭৩ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে ১৪ হাজার ৩৭০ জন আহত ব্যক্তি মাসিক ভাতার আওতায় রয়েছেন।
সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, পুনর্বাসনে আগ্রহী তিন হাজার ২৪১ জন জুলাইযোদ্ধার ডেটাবেজ তৈরি করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে এক হাজার ৯৩৭ জনের তালিকা প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের জন্য যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দেন।