
মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, স্বস্তি ও সংকট একে অপরের পরিপূরক। কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যখন সব পথ বন্ধ মনে হয় এবং কোনো সমাধান চোখে পড়ে না। ইসলামের শিক্ষা হলো—এমন সময় একজন মুমিন আন্তরিকভাবে মহান আল্লাহর দিকে ফিরে দোয়া করবে। কোরআনে বর্ণিত এমনই একটি মহিমান্বিত দোয়া হলো দোয়া ইউনুস, যা বিপদ-আপদ ও দুশ্চিন্তার সময়ে মুসলমানদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
হজরত ইউনুস (আ.) তাঁর জাতিকে দীর্ঘদিন আল্লাহর পথে আহ্বান করার পর আল্লাহর অনুমতির আগেই এলাকা ত্যাগ করেন। পরে সমুদ্রযাত্রার সময় তিনি একটি বিশাল মাছের পেটে বন্দি হন। সমুদ্র, রাত এবং মাছের পেট—এই তিন অন্ধকারের মধ্যে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে আল্লাহর দরবারে যে দোয়া করেন, সেটিই দোয়া ইউনুস নামে পরিচিত।
আরবি:
لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণ:
লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ-জালিমিন।
অর্থ:
"আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আপনি সর্বপ্রকার ত্রুটি থেকে পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।"
(সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৭)
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা হজরত ইউনুস (আ.)-এর দোয়ার ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, তিনি তাঁর বান্দার দোয়া কবুল করেছিলেন এবং তাকে দুশ্চিন্তা ও বিপদ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এরপর আল্লাহ ঘোষণা করেন, এভাবেই তিনি মুমিনদেরও মুক্তি দিয়ে থাকেন।
এ থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, বিপদের সময় আল্লাহর কাছে বিনয়ের সঙ্গে নিজের ভুল স্বীকার করে সাহায্য প্রার্থনা করা একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
"ইউনুস (আ.)-এর দোয়া—'লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমিন'—কোনো মুসলিম যদি কোনো বিষয়ে এ দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, আল্লাহ অবশ্যই তার দোয়া কবুল করেন।"
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫০৫)
হাদিস থেকে বোঝা যায়, এই দোয়া তওবা, বিনয় ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার এক অনন্য প্রকাশ।
শরিয়তে দোয়া ইউনুস নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বেঁধে দেওয়া হয়নি। তাই বিপদ, অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা, আর্থিক সংকট, পারিবারিক সমস্যা বা যেকোনো কঠিন সময়ে আন্তরিকতার সঙ্গে যতবার ইচ্ছা এই দোয়া পড়া যায়।
তবে সমাজে প্রচলিত 'খতমে ইউনুস' নামে নির্দিষ্ট সংখ্যায় (যেমন ১ লাখ ২৫ হাজার বার) দোয়া পাঠের যে প্রচলন রয়েছে, তার পক্ষে সহিহ শরয়ি দলিল পাওয়া যায় না। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যাকে বাধ্যতামূলক মনে না করে, একাগ্রতা ও ইখলাসের সঙ্গে নিজের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করাই ইসলামের শিক্ষা।
আন্তরিকতার সঙ্গে এই দোয়া পাঠ করলে আল্লাহর ইচ্ছায়—
তবে মনে রাখতে হবে, দোয়া কোনো যান্ত্রিক বা নিশ্চিত ফল পাওয়ার মাধ্যম নয়। দোয়া কবুল হওয়া সম্পূর্ণ আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা, হিকমত ও উত্তম ফয়সালার ওপর নির্ভরশীল।
দোয়া ইউনুস শুধু একটি দোয়া নয়; এটি আল্লাহর প্রতি বিনয়, আত্মসমালোচনা, তওবা এবং পূর্ণ নির্ভরতার এক অনন্য শিক্ষা। তাই জীবনের যেকোনো কঠিন সময়ে আন্তরিকতার সঙ্গে এই দোয়া পাঠ করা একজন মুমিনের জন্য উত্তম আমল।