
ফুটবলে কিছু ম্যাচ শুধু জয়-পরাজয়ের গল্প নয়, ইতিহাসের পুনর্জন্মও হয়ে ওঠে। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার মাধ্যমে ঠিক এমনই এক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে আর্জেন্টিনা। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা যে পথ দেখিয়েছিলেন, চার দশক পর সেই পথেই হাঁটলেন লিওনেল মেসি।
১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ আজও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। সেই জয়ের ধারাবাহিকতায় আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতেছিল। ২০২৬ সালে উত্তর আমেরিকার মাটিতে আবারও ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছেছে আলবিসেলেস্তেরা।
ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ফকল্যান্ড যুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং দুই দলের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ম্যাচটিকে বাড়তি উত্তেজনা এনে দেয়। প্রথমার্ধে গোল না হলেও দুই দলের শারীরিক লড়াই ও আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠে সেমিফাইনাল।
বিরতির পর ৫৫তম মিনিটে মর্গান রজার্সের ক্রস থেকে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। একসময় মনে হচ্ছিল ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবারের মতো আবারও বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন পূরণ করতে যাচ্ছে থ্রি লায়ন্সরা।
কিন্তু ম্যাচের শেষ ভাগে বদলে যায় দৃশ্যপট। আর্জেন্টিনার আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ৮৫তম মিনিটে তার নিখুঁত পাস থেকে বক্সের বাইরে দুর্দান্ত শটে সমতা ফেরান এনজো ফার্নান্দেজ। এরপর যোগ করা সময়ের (৯০+২ মিনিট) নাটকীয় মুহূর্তে মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে জয়সূচক গোল করেন বদলি হিসেবে নামা লাওতারো মার্তিনেজ।
এই ম্যাচে গোল না করলেও দুটি গোলেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন মেসি। পাশাপাশি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ৯টি সফল ড্রিবলিং ও দুটি গোল তৈরির কীর্তি গড়ে নতুন ইতিহাসও স্পর্শ করেন তিনি। ম্যাচ শেষে মাঠে হাঁটু গেড়ে বসে তার আবেগঘন উদযাপন অনেকের কাছেই ম্যারাডোনার স্মৃতিকে নতুন করে ফিরিয়ে আনে।
এই জয়ের মাধ্যমে আর্জেন্টিনা এখন বিশ্বকাপ ফাইনালে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ ইউরোপের শক্তিশালী দল স্পেন। শিরোপা জিততে পারলে ইতিহাসে তৃতীয় দল হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের বিরল কীর্তি গড়বে আলবিসেলেস্তেরা।
চার দশকের ব্যবধানে দুটি বিশ্বকাপ, একই প্রতিপক্ষ, একই স্বপ্ন আর একই গন্তব্য—ফাইনাল। তাই ফুটবলপ্রেমীদের কাছে আজ আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, ম্যারাডোনা ও মেসি শুধু দুই কিংবদন্তি নন, তারা আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের একই সুতোয় গাঁথা দুই মহানায়ক।