
দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযান চলমান থাকলেও খুনোখুনি ও সহিংসতার ঘটনা থামছে না। নতুন বছরের প্রথম ছয় দিনেই দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত আটটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় গুলি ও ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে, যা আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তা শঙ্কা আরও গভীর করেছে।
গত সোমবার মাত্র পাঁচ ঘণ্টার ব্যবধানে তিন জেলায় তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। সন্ধ্যায় যশোরের মনিরামপুরে রানা প্রতাপ বৈরাগী নামে এক ব্যবসায়ীকে মাথায় গুলি ও ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। রাত ৮টার দিকে চট্টগ্রামের রাউজানে মুহাম্মদ জানে আলম সিকদার নামে এক যুবদল নেতাকে মাথায় গুলি করে খুন করা হয়। এর তিন ঘণ্টা পর নরসিংদীর পলাশে মনি চক্রবর্তী নামে এক মুদি দোকানিকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
নতুন বছরের শুরুতেই ঘটে যাওয়া আট হত্যাকাণ্ডের মধ্যে পাঁচটিতেই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে দুজনকে মাথায় এবং একজনকে ঘাড়ে গুলি করা হয়। অন্য ঘটনায় কুপিয়ে, শ্বাসরোধ ও গলাকেটে হত্যার তথ্য মিলেছে। নিহতদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, কিশোর ও শিশু রয়েছে।
নির্বাচন সামনে রেখে সহিংসতার এই প্রবণতা সম্ভাব্য প্রার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার এবং ব্যক্তিগত শত্রুতাকে কেন্দ্র করে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে হতাশাজনক উল্লেখ করে বলেন, অনেক এলাকায় এখনো চিহ্নিত সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের গ্রেপ্তার না করলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
গত ১৩ ডিসেম্বর সরকার অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ শুরু করে। ২৩ দিনে এই অভিযানে ১৫ হাজার ৯ জনকে গ্রেপ্তার এবং ২১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এই অভিযানের মধ্যেও একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে।
পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম জানিয়েছেন, দেশে বছরে গড়ে সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার হত্যাকাণ্ড ঘটে। রাজনৈতিক বিরোধ থেকে সাম্প্রতিক কিছু হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হচ্ছে। তিনি বলেন, অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হলে সংঘাত কিছুটা কমে, তবে সব হত্যাকাণ্ড আগেভাগে ঠেকানো সম্ভব নয়।
নির্বাচনী নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখনো এক হাজার ৩৩৩টি অস্ত্র এবং দুই লাখের বেশি গুলির হদিস নেই। বেহাত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে চায়না রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি ও পিস্তল।
লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে সরকার পুরস্কার ঘোষণা করলেও এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ও পরে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে এখনো ৭১০ জন ধরা পড়েনি। তাদের মধ্যে হত্যা মামলার আসামি ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দিও রয়েছে। কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গুলির একটি অংশও এখনো উদ্ধার হয়নি।
কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পলাতক বন্দি ও লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে তিন হাজার ৫০৯টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহতের সংখ্যাও আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধুমাত্র অভিযান নয়—দ্রুত বিচার, বেহাত অস্ত্র উদ্ধার, পলাতক অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ না করলে নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।