
আর্জেন্টিনার আকাশে এক চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। প্রশিক্ষণ ফ্লাইট চলাকালে এক অভিজ্ঞ পাইলট চলন্ত উড়োজাহাজ থেকে মাঝ আকাশেই ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ হারান। তবে তার সঙ্গে থাকা ২২ বছর বয়সী শিক্ষানবিশ অসাধারণ ধৈর্য ও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করাতে সক্ষম হন। ঘটনাটি দেশটির কোর্দোবা প্রদেশের টোলেডো এলাকায় ঘটে এবং তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিহত পাইলটের নাম লিয়ান্দ্রো আন্দ্রেস বেরতাজ্জো (৪২)। তিনি একটি সেসনা-১৫০ প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজে শিক্ষানবিশ রোসারিওকে নিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করছিলেন। আকাশে থাকা অবস্থায় তিনি হঠাৎ শিক্ষানবিশকে বলেন, “তুমি জানো তোমার কী করতে হবে, এগিয়ে যাও।” এরপর তিনি নিজের হেডসেট ও সিটবেল্ট খুলে উড়োজাহাজের দরজা খুলে নিচে ঝাঁপ দেন।
ঘটনার পরপরই লিয়ান্দ্রো বেরতাজ্জোর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দেশটির সরকারি কৌঁসুলির দপ্তর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম CNN এবং আর্জেন্টিনার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম Todos Noticias-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
জানা গেছে, লিয়ান্দ্রো বেরতাজ্জো Flying Parrot Córdoba নামে একটি ফ্লাইট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক এদুয়ার্দো আলভারেজ জানিয়েছেন, ঘটনার আগে পাইলটের আচরণে কোনো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়নি। বরং একই দিনে তিনি আরেকজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে সফলভাবে একটি প্রশিক্ষণ ফ্লাইট সম্পন্ন করেছিলেন।
আলভারেজ বলেন, বেরতাজ্জো ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ, দায়িত্বশীল এবং প্রাণবন্ত একজন প্রশিক্ষক। তার এমন সিদ্ধান্ত সহকর্মীদের জন্যও সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। তিনি আরও বলেন, ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার গতিতে চলা একটি ছোট উড়োজাহাজের দরজা খুলে ফেলা সহজ কাজ নয়। তবু কীভাবে এবং কেন তিনি এমন কাজ করলেন, সেটিই এখন তদন্তের প্রধান বিষয়।
পাইলটের আকস্মিক অনুপস্থিতিতে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন শিক্ষানবিশ রোসারিও। তবে আতঙ্কিত না হয়ে তিনি প্রশিক্ষণে অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন। পরবর্তীতে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ছাড়াই উড়োজাহাজটি নিরাপদে অবতরণ করান। তার এই উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসিকতার প্রশংসা করছেন বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাইলটের মৃত্যুর পেছনে কী কারণ ছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এটি আত্মহত্যা, মানসিক সংকট, নাকি অন্য কোনো পরিস্থিতির ফল—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উড়োজাহাজটির কারিগরি অবস্থা, ফ্লাইট রেকর্ড এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা চলছে।
নিহত লিয়ান্দ্রো বেরতাজ্জো দীর্ঘদিন ধরে পাইলট ও ফ্লাইট প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। আর্জেন্টিনার পাশাপাশি প্রতিবেশী চিলিতেও তিনি ফ্লাইট প্রশিক্ষণের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সহকর্মীদের কাছে তিনি একজন অভিজ্ঞ ও পেশাদার প্রশিক্ষক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।
এই ঘটনার পর আর্জেন্টিনার বিমান চলাচল মহলে নিরাপত্তা, পাইলটদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং প্রশিক্ষণ ফ্লাইটে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষানবিশ রোসারিওর দক্ষতা একটি সম্ভাব্য বড় বিমান দুর্ঘটনা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।