
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপ (TMTG) দায়ের করা ৩.৮ বিলিয়ন ডলারের মানহানির মামলা খারিজ করে দিয়েছেন মার্কিন আদালত। বহুল আলোচিত এই মামলার রায়ে আদালত বলেছেন, সংবাদমাধ্যমটি ইচ্ছাকৃতভাবে বা সত্যতা উপেক্ষা করে মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করেছে—এমন অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি ট্রাম্প মিডিয়া।
ফ্লোরিডার টাম্পাভিত্তিক মার্কিন জেলা বিচারক থমাস বারবার মামলার সারসংক্ষেপ রায়ে ওয়াশিংটন পোস্টের পক্ষেই সিদ্ধান্ত দেন। একই সঙ্গে ট্রাম্প মিডিয়ার আবেদন নাকচ করে দেন তিনি। বিচারক জানান, মামলার পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায় পরবর্তী সময়ে প্রকাশ করা হবে।
২০২৩ সালে দায়ের করা এই মামলায় ট্রাম্প মিডিয়া অভিযোগ করেছিল, ওয়াশিংটন পোস্ট দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ১৩ মে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ট্রাম্প মিডিয়ার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগের অর্থায়ন কার্যক্রম নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে বলে দাবি করে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে আদালত মনে করেন, ট্রাম্প মিডিয়া এমন কোনো শক্ত প্রমাণ দিতে পারেনি, যা থেকে বোঝা যায় সংবাদপত্রটি তথ্যটি মিথ্যা জেনেও প্রকাশ করেছে কিংবা সত্যতা যাচাইয়ে চরম অবহেলা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মানহানি আইনে জনপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মামলা জিততে হলে "Actual Malice" বা "ইচ্ছাকৃত বিদ্বেষপূর্ণ প্রকাশ"-এর বিষয়টি প্রমাণ করতে হয়। অর্থাৎ, সংবাদমাধ্যমকে জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করতে হবে অথবা সত্যতা যাচাইয়ে গুরুতর অবহেলা করতে হবে। আদালতের মতে, ট্রাম্প মিডিয়া এই আইনি মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
রায় ঘোষণার পর ওয়াশিংটন পোস্টের এক মুখপাত্র আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, আদালতের এই সিদ্ধান্তে তারা সন্তুষ্ট এবং পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায়ের অপেক্ষায় রয়েছেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প মিডিয়া জানিয়েছে, তারা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার বিষয়টি বিবেচনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র দাবি করেন, তদন্তের পর ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের প্রতিবেদনের কিছু তথ্য ভুল ছিল বলে সংশোধন করেছে। তাই তারা মনে করেন, তথ্যগুলো মানহানিকর ছিল কি না, সেটি জুরি বোর্ডের মাধ্যমে বিচার হওয়া উচিত ছিল।
উল্লেখ্য, মামলার তদন্ত চলাকালে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের মে মাসে ওয়াশিংটন পোস্ট ২০২৩ সালের ওই প্রতিবেদনের একটি সংশোধনী প্রকাশ করে। সেখানে জানানো হয়, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল ট্রাম্প মিডিয়া ২ লাখ ৪০ হাজার ডলার ঋণ-রেফারেল ফি পরিশোধ করেছিল। কিন্তু পরবর্তী তদন্তে দেখা যায়, ওই তথ্যটি সঠিক ছিল না।
তবে ওয়াশিংটন পোস্টের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় যে তথ্য-উপাত্ত তাদের কাছে ছিল, তার ভিত্তিতেই সংবাদটি প্রকাশ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে নতুন তথ্য পাওয়ার পরই সংশোধনী প্রকাশ করা হয়েছে।
ট্রাম্প মিডিয়া বর্তমানে ট্রুথ সোশ্যাল (Truth Social) প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয় হলেও আর্থিকভাবে এখনো লাভজনক অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির আয় ছিল ১০ লাখ মার্কিন ডলারেরও কম।
এটি ট্রাম্প মিডিয়ার প্রথম ব্যর্থ মানহানির মামলা নয়। এর আগে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর বিরুদ্ধেও একই ধরনের একটি মামলা করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে সেটিও গত নভেম্বরে আদালত খারিজ করে দেন। পরে সংশোধিত অভিযোগ দাখিল করা হলেও চলতি বছরের এপ্রিলে প্রতিষ্ঠানটি শেষ পর্যন্ত সেই মামলাও প্রত্যাহার করে নেয়।
সাম্প্রতিক এই রায় যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, মানহানি আইন এবং জনপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের আইনি সীমারেখা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, "Actual Malice" নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা জেতা সবসময়ই কঠিন হয়ে থাকে।