
তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে জোটের সদস্য দেশগুলো প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে শত শত কোটি ডলার মূল্যের একাধিক সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন, আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এসব উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে ন্যাটো।
সম্মেলনের অংশ হিসেবে আয়োজিত প্রতিরক্ষা শিল্প ফোরামে বক্তব্য দিয়ে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, সদস্য দেশগুলো নতুন বড় প্রতিরক্ষা প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে, যা শুধু সামরিক সক্ষমতাই বাড়াবে না; বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে এবং লাখো নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজনীয়তা। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের বাস্তবতায় ন্যাটোকে আরও প্রস্তুত ও সক্ষম করে তুলতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্মেলনে ঘোষিত অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত হলো যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান নর্থরপ গ্রুম্যান থেকে পাঁচটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন দীর্ঘপাল্লার নজরদারি ড্রোন কেনা। ন্যাটোর মতে, এসব ড্রোন ভবিষ্যৎ সামরিক অভিযানে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এর পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে ড্রোন প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়াতে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংঘাতে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা কৌশলে বড় পরিবর্তন এনেছে। তাই ড্রোন শনাক্ত, প্রতিরোধ এবং নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ন্যাটো।
জোট আরও জানিয়েছে, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ সদস্য দেশগুলোর জন্য বর্তমানে যত ড্রোন অপারেটর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তার তুলনায় পাঁচগুণ বেশি প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা হবে। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে চায় ন্যাটো।
এক বিবৃতিতে ন্যাটো বলেছে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তাই প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সদস্য দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ড্রোন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি।
নজরদারি ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তনের ঘোষণা এসেছে সম্মেলন থেকে। ন্যাটোর বহরে থাকা পুরোনো ই-৩ এয়ারবর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল (AWACS) বিমানগুলো ধীরে ধীরে সরিয়ে সুইডিশ প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান সাব (Saab)-এর তৈরি সর্বোচ্চ ১০টি গ্লোবালআই (GlobalEye) নজরদারি বিমান অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাও অংশীদার হিসেবে যুক্ত থাকবে।
গ্লোবালআই বিমান অত্যাধুনিক রাডার, দীর্ঘপাল্লার নজরদারি এবং বহুমাত্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সক্ষমতার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। এসব বিমান আকাশ, স্থল ও সমুদ্র—তিন ক্ষেত্রেই একযোগে নজরদারি চালাতে সক্ষম, যা ন্যাটোর সামরিক কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন এই প্রকল্পকে তার দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য গর্বের মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, গ্লোবালআই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ সুইডেনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
মার্ক রুটে আরও জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ন্যাটো সদস্য দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সদস্য দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে আসছিলেন। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে এখন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং দ্রুত পরিবর্তিত সামরিক প্রযুক্তির কারণে ন্যাটো এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে। নতুন চুক্তি ও বিনিয়োগ ভবিষ্যতে জোটের সামরিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করবে এবং সদস্য দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।