
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) এখন আর শুধু বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধ কোনো প্রযুক্তি নয়। বরং ছোট ব্যবসা, স্টার্টআপ এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্যও এটি হয়ে উঠছে কার্যকর সহায়ক। সময় ও ব্যয় কমিয়ে দ্রুত ব্যবসা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এআই যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, তার একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নারী উদ্যোক্তা মিশেল টার্নার।
শনিবার (৪ জুলাই) প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তার এই সফলতার গল্প। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মিশেল টার্নার ‘হিয়ার নাও হেলথ’ নামে একটি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান চালু করেন। মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বর্তমানে সেখানে ১৬ জন কর্মী কাজ করছেন এবং প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গরাজ্যে ফস্টার কেয়ারে থাকা শিশুদের মেডিকেইড কর্মসূচির আওতায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের অনুমোদন পেয়েছে।
মিশেল টার্নারের যাত্রা আরও অনুপ্রেরণাদায়ক কারণ তিনি প্রযুক্তি খাতের কোনো বিশেষজ্ঞ নন। ছয় সন্তানের এই মা জীবনে প্রথমবারের মতো উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নতুন ব্যবসা শুরু করার অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি সাহস হারাননি। বরং আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে নেন।
ব্যবসার প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি এআই টুল ব্যবহার করে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি, স্টার্টআপ পরিচালনা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া, বাজার বিশ্লেষণ করা এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সামনে উপস্থাপনার প্রস্তুতি নেন। এর ফলে একই সঙ্গে সময় ও খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। সাধারণত যেসব কাজের জন্য দীর্ঘ সময়, পরামর্শক এবং অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হয়, সেগুলোর অনেকটাই তিনি এআইয়ের সহায়তায় সম্পন্ন করতে সক্ষম হন।
পরবর্তীতে তার ব্যবসায় বিনিয়োগ আসে এবং সেই বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত সম্প্রসারণের সুযোগ পায়। অল্প সময়ের মধ্যেই হিয়ার নাও হেলথ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে নিজেদের কার্যক্রম বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়।
মিশেল টার্নারের ভাষায়, এআই তার জন্য একজন অভিজ্ঞ ব্যবসায়িক পরামর্শকের মতো কাজ করেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন বিষয় শেখার সুযোগ পেয়েছেন তিনি, যা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে এআই তাকে জটিল বিষয়গুলো সহজভাবে বুঝতে এবং দ্রুত বাস্তবায়ন করতে সহায়তা করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারের ফলে ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা শুরু করা আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়ে গেছে। ব্যবসা পরিকল্পনা, বাজার গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ, উপস্থাপনা তৈরি কিংবা প্রশাসনিক নানা কাজ এখন দ্রুত এবং তুলনামূলক কম ব্যয়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে নতুন উদ্যোক্তারা দ্রুত ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি করতে পারছেন।
তবে এআইয়ের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু উদ্বেগও রয়েছে। অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, ভবিষ্যতে অফিসের প্রশাসনিক ও কেরানিভিত্তিক কিছু পেশায় কর্মসংস্থানের চাহিদা কমতে পারে। কারণ এসব কাজের একটি অংশ ধীরে ধীরে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
অন্যদিকে, অনেক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এআই মানুষের চাকরি পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করবে না। বরং এটি কাজের ধরন বদলে দেবে এবং নতুন ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন তৈরি করবে। ফলে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা এবং নতুন দক্ষতা অর্জন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এআইয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভও। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শ্রমবাজারে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে, তা নিশ্চিতভাবে মূল্যায়নের জন্য আরও সময় এবং গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।