
প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার খাতের বিদ্যমান আইন, বিধি ও নীতিমালা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং নতুন নতুন যোগাযোগমাধ্যমের আবির্ভাবের ফলে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার করা হবে। প্রয়োজনে নতুন আইনও প্রণয়ন করা হবে।
রোববার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইন সময়োপযোগীকরণ এবং নতুন আইন প্রণয়ন-সংক্রান্ত এক সভায় সভাপতির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইন পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুপারিশ তৈরির নির্দেশ দেন।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে মানুষের জীবনযাপন, যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান এবং সামাজিক আচরণের সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তি গভীরভাবে সম্পৃক্ত। প্রযুক্তির অগ্রগতি যেমন নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন ধরনের ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর এবং সময়োপযোগী আইনি কাঠামো গড়ে তোলা এখন অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও জানান, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিদ্যমান সব আইন, বিধি, প্রবিধান ও নীতিমালার পর্যালোচনার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। কোন আইন আধুনিকায়ন প্রয়োজন, কোথায় নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে এবং কোন ক্ষেত্রে আইনি ঘাটতি রয়েছে—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে দ্রুত সুপারিশ দিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, একসময় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম মূলত প্রিন্ট মিডিয়া এবং প্রচলিত সম্প্রচারমাধ্যমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, অনলাইনভিত্তিক কনটেন্ট এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। এর ফলে অনেক নতুন সেবা ও প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে, যেগুলোর অনেকই প্রচলিত আইনি কাঠামোর বাইরে রয়েছে। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনও আধুনিক করা প্রয়োজন।
মন্ত্রী জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং অনলাইন পরিবেশের নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করেছে। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এসব দেশের আইনি কাঠামো ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অধ্যয়ন করে বাংলাদেশের উপযোগী একটি কার্যকর আইনগত কাঠামোর প্রস্তাব তৈরির নির্দেশ দেন।
তিনি আরও বলেন, সাইবার জগৎ, ডিজিটাল ট্রান্সমিশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবাগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, টেলিযোগাযোগ খাত এবং অবকাঠামো-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত গ্রহণের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সভায় মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নতুন চ্যালেঞ্জগুলো দ্রুত শনাক্ত করা, দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্র নির্ধারণ, সংশ্লিষ্ট অংশীজন চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণের নির্দেশনা দেন। তার মতে, সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন করতে হলে বাস্তব পরিস্থিতি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
সভায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা, অতিরিক্ত সচিব শাহ আলম, মন্ত্রণালয়ের আইনজীবী প্যানেলের সদস্যবৃন্দ এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় বিদ্যমান আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা, ডিজিটাল যুগের নতুন চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তথ্য ও সম্প্রচার খাতের আইন ও নীতিমালা আধুনিক প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল পরিবেশের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন যোগাযোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার ক্ষেত্রে একটি সুসংগঠিত ও কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তোলার পথও সুগম হতে পারে।