
দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা কমাতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যাপক সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ব্যবসা সহজীকরণ, সরকারি সেবার ডিজিটাল রূপান্তর, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুমোদন প্রদান এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত এই সংস্কার প্যাকেজকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বৃহৎ উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, পরিকল্পনাগুলো যতই যুগোপযোগী হোক না কেন, এর প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের আগে বাংলাদেশের জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে সরকারের নতুন উদ্যোগ সময়োপযোগী হলেও কেবল নীতিমালা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; মাঠপর্যায়ে সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান দিক হলো একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ প্ল্যাটফর্ম চালু করা। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবসা নিবন্ধন, লাইসেন্স গ্রহণ, বিভিন্ন ধরনের অনুমোদন এবং আবেদন ট্র্যাকিং এক জায়গা থেকেই করা যাবে। সরকার জানিয়েছে, সঠিকভাবে আবেদন জমা দিলে অধিকাংশ সরকারি সেবা সাত কার্যদিবসের মধ্যে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া সব অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য সার্ভিস লেভেল এগ্রিমেন্ট (SLA) বাধ্যতামূলক করা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা না দিলে কিছু ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় অনুমোদনের ব্যবস্থাও চালু হতে পারে। একই সঙ্গে কোম্পানি নিবন্ধনের পুরো প্রক্রিয়া—নাম অনুমোদন, ফি পরিশোধ এবং নিবন্ধন সনদ প্রদান—অনলাইনে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু সহজ করতে অনলাইনভিত্তিক প্রভিশনাল অনুমোদনের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। এতে উদ্যোক্তারা দ্রুত ব্যবসা শুরু করতে পারবেন এবং পরবর্তী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করবেন।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও একাধিক সুবিধা যুক্ত করা হচ্ছে। কর্মী নিয়োগের অনুমতি সাত দিনের মধ্যে, বিনিয়োগ ভিসা ১০ দিনের মধ্যে প্রদান এবং পাঁচ বছরের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বড় বিনিয়োগ প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিএসসিআইসি) মাধ্যমে বিশেষ সেবা দেওয়া হবে। এছাড়া ২৪ ঘণ্টা চালু থাকবে বিনিয়োগকারী সহায়তা ডেস্ক ও অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা।
সরকার বিনিয়োগকারীদের আইনি সুরক্ষা জোরদার করতে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি সম্প্রসারণ এবং দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি হালনাগাদের উদ্যোগও নিচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় ট্রেড লাইসেন্স সেবা ধীরে ধীরে জাতীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা হবে, যাতে আবেদন, নবায়ন ও ফি পরিশোধ সম্পূর্ণ অনলাইনে করা সম্ভব হয়।
শিল্পায়নকে আরও গতিশীল করতে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব শিল্পাঞ্চলে জমি, বিদ্যুৎ, পানি এবং প্রয়োজনীয় প্রাথমিক অনুমোদন আগে থেকেই প্রস্তুত থাকবে, ফলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারবে।
লাভ ও মূলধন বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রফিট রিপ্যাট্রিয়েশন আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের লেনদেন সহজ করতে এনআইটিএ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ ফেরত আনা ও পুনঃবিনিয়োগের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সহজ করা হয়েছে। নিরীক্ষকের সনদের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ায় এখন এক কর্মদিবসের মধ্যেই এসব লেনদেন সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তার মতে, অতীতেও অনেক সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, প্রশাসনিক সংস্কারই এখন বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রধান উপায়। আর ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমানের মতে, সহজ লাইসেন্সিংয়ের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ সুদের হার, বৈদেশিক মুদ্রার অনিশ্চয়তা এবং চুক্তি বাস্তবায়নের দুর্বলতার মতো সমস্যাগুলোরও সমাধান জরুরি।
সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি তদারকিতে সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন এবং একটি বিশেষায়িত পর্যবেক্ষণ ওয়েবসাইট চালুর পরিকল্পনা করেছে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সেবার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ দাখিল এবং বিলম্ব বা অনিয়মের বিষয়ে সরাসরি মতামত জানাতে পারবেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘোষিত সংস্কারগুলো সময়মতো এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে এবং দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে।