
দেশে গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বন্ধে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্তিসহ সব গোয়েন্দা সংস্থার কাঠামোগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে গুম-সংক্রান্ত কমিশন। কমিশনের মতে, বিভিন্ন সময়ে এসব সংস্থাকে রাজনৈতিক স্বার্থে অপব্যবহার করা হয়েছে এবং তারা ক্ষমতার অংশ হয়ে ওঠার প্রবণতায় অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে।
সোমবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে কমিশনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, অতীতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এমন সব কাজে যুক্ত হয়েছে, যা তাদের সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। ব্যাংক বা মিডিয়া হাউস দখলের মতো ঘটনায় গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা প্রশ্নবিদ্ধ নজির হিসেবে উঠে এসেছে।
কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আগের সরকারগুলোর পাশাপাশি সদ্য বিদায়ী সরকারও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যবহার করেছে। এই চর্চা থেকে বেরিয়ে এসে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোয় ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে মত দেয় কমিশন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব মূলত পুলিশের। সেনাবাহিনীর কাজ প্রশিক্ষণ ও জাতীয় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। এ কারণে বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে সেনা কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশের মধ্য থেকে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত সদস্যদের নিয়ে একটি এলিট ফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
গুম তদন্তের পরিসংখ্যান তুলে ধরে কমিশন জানায়, দাখিল করা এক হাজার ৯১৩টি অভিযোগ যাচাই শেষে এক হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সক্রিয় বিবেচনায় রাখা হয়। এসব অভিযোগে ২৫১ জন এখনো নিখোঁজ এবং ৩৬ জনের গুমের পর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, গুমের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি অভিযোগ র্যাবের বিরুদ্ধে, এরপর পুলিশের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠে এসেছে।
কমিশনের মতে, গুম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত চর্চা হিসেবে সংঘটিত হয়েছে। তদন্তে অন্তত ৪০টি গোপন বন্দিশালার সন্ধান পাওয়া গেছে, যার একটি বড় অংশ র্যাবের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। কমিশন কাজ শুরু করার পর আলামত নষ্টের প্রবণতাও লক্ষ্য করা গেছে বলে দাবি করা হয়।
গুম প্রতিরোধ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কমিশন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স প্রিভেনশন অ্যান্ড রিড্রেস অর্ডিন্যান্স, ২০২৫ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অর্ডিন্যান্স, ২০২৫ প্রণয়নে সহায়তার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং সত্য ও স্মৃতির সংরক্ষণে আয়নাঘরগুলোকে জাদুঘরে রূপান্তরের সুপারিশ করেছে। কমিশনের মতে, এসব পদক্ষেপই ভবিষ্যতে গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।