
দেশের অর্থনীতিকে টেকসইভাবে পুনরুদ্ধার করতে হলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি বলেছেন, কেবল বড় বাজেট প্রণয়ন করলেই হবে না, বরং সেই বাজেট দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন, ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি) প্রাঙ্গণে ‘বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে এবারের বাজেট’ শীর্ষক ছায়া সংসদ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি এবং এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।
অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, একটি নির্বাচিত সরকার তার উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বড় বাজেট গ্রহণ করতেই পারে। তবে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ানো এবং অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ধারাবাহিক উদ্যোগ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়াও জরুরি।
তিনি আরও বলেন, প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমানের চীন ও মালয়েশিয়া সফর দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তার ভাষায়, এই সফর ভবিষ্যতে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে একটি সম্ভাবনাময় মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রসঙ্গ তুলে অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে করপোরেট করের হার এখনো অনেক প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বেশি। ভারত, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশের সঙ্গে কর কাঠামোর সামঞ্জস্য না আনলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা কঠিন হবে। তিনি প্রতিযোগিতামূলক করনীতি গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বক্তব্যে তিনি অতীতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করতে পারত না। একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও অনিয়ম প্রাধান্য পেয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অধ্যাপক আবু আহমেদের মতে, বর্তমান সরকার বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পরিবর্তে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিচ্ছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। তিনি দাবি করেন, গত দুই বছরে ৫০০টির বেশি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। এর জন্য গ্যাস, বিদ্যুৎ ও উৎপাদন সক্ষমতার সংকটকে তিনি অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত সুবিধা, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে ডি-রেগুলেশন কার্যকর করার আহ্বান জানান।
এছাড়া তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও অভ্যন্তরীণ আয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে ঋণের চাপ বাড়তে পারে। তাই করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করের আওতা সম্প্রসারণ, স্বচ্ছ করব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং করদাতাদের হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে আয়োজিত ‘এবারের বাজেট বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম’ শীর্ষক ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ঢাকা কলেজ বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজিকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। শেষে বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারী দলের মধ্যে ট্রফি, ক্রেস্ট এবং সনদপত্র বিতরণ করা হয়।