
চলতি বছরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) প্রবেশ ও আবাসনসংক্রান্ত ভিসা নীতিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। প্রবাসী নাগরিক, পর্যটক, বিনিয়োগকারী এবং চিকিৎসাসেবাপ্রত্যাশী বিদেশিদের জন্য এসব পরিবর্তন দেশটির ভিসা ব্যবস্থাকে আরও নমনীয় ও আধুনিক করেছে। শনিবার (৪ জুলাই) খালিজ টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব পরিবর্তনের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউএই দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। কর্মসংস্থান, ব্যবসা, পর্যটন ও চিকিৎসাসেবার জন্য দেশটি বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের কাছে জনপ্রিয়। নতুন ভিসা নীতিগুলো সেই আকর্ষণকে আরও বাড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রথম বড় পরিবর্তন হলো অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধার সম্প্রসারণ। ইউএই ফেডারেল অথরিটি এবার ছয়টি দেশের নাগরিকদের জন্য এই সুবিধা বাড়িয়েছে। এর ফলে ১৪ দিন ও ৬০ দিনের ভিসা ক্যাটাগরিতে আরও বেশি বিদেশি নাগরিক সহজে দেশটিতে প্রবেশ করতে পারবেন। আগে এই সুবিধা মূলত নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী ভারতীয় নাগরিকদের জন্য সীমিত ছিল। এখন এর আওতায় এসেছে ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, কেনিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকরাও।
দ্বিতীয় পরিবর্তনটি পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন দুবাই ভ্রমণে আগ্রহীরা মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই একবার প্রবেশযোগ্য পর্যটক ভিসার অনুমোদন পাবেন। গত মাসে দেশটি জানায়, অনুমোদিত পর্যটন অফিসের মাধ্যমে আবেদন করলে ৩০ থেকে ৬০ দিনের মেয়াদের পর্যটক ভিসা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই অনুমোদন দেওয়া হবে। এতে ভ্রমণ পরিকল্পনা আরও সহজ হবে এবং শেষ মুহূর্তের যাত্রার ক্ষেত্রেও সুবিধা পাওয়া যাবে।
তৃতীয় পরিবর্তন এসেছে বিনিয়োগকারীদের আবাসিক ভিসার নিয়মে। দুবাই কর্তৃপক্ষ সম্পত্তির ভিত্তিতে দেওয়া দুই বছরের আবাসিক ভিসার শর্তে সংশোধন এনেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একক মালিকানার ক্ষেত্রে আগে যে ন্যূনতম সাত লাখ ৫০ হাজার দিরহাম মূল্যের সম্পত্তি থাকার শর্ত ছিল, তা বাতিল করা হয়েছে। তবে আবেদনকারীকে অবশ্যই সম্পত্তিটির একক মালিক হতে হবে। অন্যদিকে, যদি সম্পত্তির একাধিক মালিক থাকে, তাহলে প্রত্যেক বিনিয়োগকারীর মালিকানার অংশের মূল্য কমপক্ষে চার লাখ দিরহাম হতে হবে। মালিকানা সমানভাবে ভাগ হলেও এই শর্ত পূরণ করতে হবে।
চতুর্থ পরিবর্তনটি সাময়িক জরিমানামুক্ত সময়সীমা নিয়ে। আঞ্চলিক আকাশসীমা বন্ধ এবং বিমান চলাচলে বিঘ্নের কারণে যেসব দর্শনার্থী অতিরিক্ত সময় অবস্থান করছিলেন, তাদের জন্য জরিমানা ছাড়া আরও ৩০ দিনের অতিরিক্ত সময় দিয়েছে দেশটি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিশেষ পরিস্থিতির অবসান হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আগামী ৯ জুলাইয়ের মধ্যে ভিসার অবস্থা নিয়মিত করতে হবে অথবা আমিরাত ত্যাগ করতে হবে। এই সিদ্ধান্ত অনেক বিদেশি নাগরিকের জন্য স্বস্তির খবর হয়ে এসেছে।
পঞ্চম পরিবর্তন হলো স্মার্ট মেডিকেল ভিসা চালুর উদ্যোগ। চিকিৎসার জন্য আমিরাতে যাওয়া বিদেশি রোগীদের জন্য এই নতুন ভিসা ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে দেশটি। এ লক্ষ্যে জেনারেল ডিরেক্টরেট অব আইডেন্টিটি অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাফেয়ার্স-দুবাই এবং দুবাই হেলথ অথরিটি একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে চিকিৎসাপ্রার্থী পর্যটকদের জন্য ভিসা, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। রোগীদের আমিরাতে আসার আগের প্রস্তুতি থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও পরবর্তী ফলো-আপ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সহজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ষষ্ঠ পরিবর্তনটি নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। ইবোলা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো, উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের নাগরিকদের জন্য নতুন ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে আমিরাত। ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি, ক্রাইসিস অ্যান্ড ডিজাস্টার্স ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (এনসিইএমএ) এবং আইসিপি যৌথভাবে এই সতর্কতামূলক পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়। গত ৬ জুন থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নয়ন বা অবনতির ওপর ভিত্তি করে এই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইউএই-এর নতুন ভিসা নীতিগুলো দেশটির অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, দ্রুত ও ব্যবহারবান্ধব করে তুলছে। প্রবাসী, পর্যটক, বিনিয়োগকারী এবং চিকিৎসাসেবাপ্রত্যাশী—সব শ্রেণির মানুষের জন্যই এসব পরিবর্তন নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ, ব্যবসা বা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাওয়া মানুষের জন্য এই সংস্কারগুলো বড় সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।