
বিশ্বকাপে বড় অঘটন ঘটিয়ে শেষ ষোলো থেকে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা প্যারাগুয়ের সামনে এবার আরও কঠিন পরীক্ষা। শনিবার ফিলাডেলফিয়ায় তারা মুখোমুখি হবে বর্তমান সময়ের অন্যতম শক্তিশালী দল ফ্রান্সের। একদিকে জার্মানিকে বিদায় করে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর প্যারাগুয়ে, অন্যদিকে সুইডেনকে সহজেই হারিয়ে টানা জয়ের ধারায় থাকা ফ্রান্স। ফলে এই ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে।
শেষ ষোলোর ম্যাচে জার্মানির বিপক্ষে নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে ১-১ সমতা ছিল প্যারাগুয়ের। পরে টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে ইতিহাস গড়ে তারা। জয়ের শেষ শটটি নিয়ে দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলেন হোসে কানালে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে এমন ফলের কথা খুব কম মানুষই কল্পনা করেছিলেন। কারণ র্যাঙ্কিংয়ে জার্মানি ছিল দশম, আর প্যারাগুয়ে ছিল ৪১তম। এত বড় ব্যবধান পেরিয়ে নকআউট পর্বে জয় পাওয়া নিঃসন্দেহে টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় চমক।
তবে শুরুটা মোটেও ভালো ছিল না প্যারাগুয়ের। নিজেদের প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪-১ গোলে হেরে যায় তারা। সেই ধাক্কা সামলে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায় দলটি। কোচ গুস্তাভো আলফারোর অধীনে রক্ষণভাগ অনেক বেশি সংগঠিত হয়েছে, আর দলগত লড়াইও বেড়েছে। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকিয়ে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার কৌশলেই এখন বেশি ভরসা রাখছে প্যারাগুয়ে।
আলফারোর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্যারাগুয়ের পারফরম্যান্সও চোখে পড়ার মতো। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ১২ ম্যাচে তারা মাত্র একবার হেরেছে। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে শেষ ২৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে তাদের হার মাত্র পাঁচটি। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, দলটি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী। তাই ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও তারা নিজেদের সুযোগ খুঁজে নিতে চাইবে।
তবে ইতিহাস ফ্রান্সের পক্ষেই কথা বলছে। দুই দলের পাঁচ দেখায় এখনো জয়ের দেখা পায়নি প্যারাগুয়ে। দুটি ম্যাচ ড্র হলেও তিনবার জিতেছে ফ্রান্স। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়েও অতিরিক্ত সময়ে একমাত্র গোলে প্যারাগুয়েকে বিদায় করেছিল ফরাসিরা। অতীতের এই স্মৃতি প্যারাগুয়ের জন্য যেমন অনুপ্রেরণার, তেমনি ফ্রান্সের জন্য আত্মবিশ্বাসেরও।
এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত চারটি ম্যাচই জিতেছে ফ্রান্স। স্বাগতিক মেক্সিকো ও আর্জেন্টিনার সঙ্গে তারাও শতভাগ জয়ের রেকর্ড ধরে রেখেছে। চার ম্যাচে ১২ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতাও তারা। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিসে ও ব্র্যাডলি বারকোলাকে নিয়ে গড়া আক্রমণভাগ দারুণ ছন্দে রয়েছে। শেষ ম্যাচে সুইডেনকে ৩-০ গোলে হারানোর পথে জোড়া গোল করেন এমবাপ্পে। ফলে প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগের সামনে এবার কঠিনতম পরীক্ষাই অপেক্ষা করছে।
ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ে দেশম অবশ্য প্রতিপক্ষকে মোটেও হালকাভাবে নিচ্ছেন না। তার মতে, জার্মানির বিপক্ষে প্যারাগুয়ের জয় কোনো দুর্ঘটনা নয়। তাই নিজেদের সেরাটা খেলতে হবে ফরাসিদের। দেশম জানেন, নকআউট পর্বে একটি ভুলই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। তাই তিনি খেলোয়াড়দের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং শুরু থেকেই চাপ ধরে রাখার পরিকল্পনা করছেন।
প্যারাগুয়ের দলে অবশ্য কিছু দুশ্চিন্তাও আছে। রক্ষণভাগের খেলোয়াড় ওমার আলদেরেতে এখনও চোট কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তাই তার খেলার সম্ভাবনা কম। তবে নিষেধাজ্ঞা শেষে মাঝমাঠের খেলোয়াড় দিয়েগো গোমেজ দলে ফিরছেন, যা আলফারোর জন্য স্বস্তির খবর। মাঝমাঠে তার উপস্থিতি প্যারাগুয়ের আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই দিকেই ভারসাম্য আনতে পারে।
অন্যদিকে ফ্রান্স শিবিরেও চোটের সমস্যা রয়েছে। নতুন করে চোট পেয়েছেন চুয়েমেনি, আর মার্কুস তুরামের খেলা এখনও অনিশ্চিত। তাই সুইডেনের বিপক্ষে যে দল খেলেছিল, সেই দলই প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তবে ফ্রান্সের শক্তি হলো তাদের স্কোয়াডের গভীরতা। একজন না থাকলেও অন্য কেউ দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।
এই ম্যাচে বিশেষ নজর থাকবে এমবাপ্পের দিকে। বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা এখন ১৮। আর একটি গোল করলে তিনি সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় লিওনেল মেসির ১৯ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করবেন। অন্যদিকে ওলিসে আর একটি গোল বানিয়ে দিতে পারলেই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ছয়টি সহায়তামূলক পাসের রেকর্ডে ভাগ বসাবেন। ফলে ব্যক্তিগত মাইলফলকের দিক থেকেও ম্যাচটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
সব দিক বিবেচনায় শক্তির বিচারে এগিয়ে রয়েছে ফ্রান্স। তবে জার্মানিকে বিদায় করে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর প্যারাগুয়ে আরেকটি অঘটন ঘটাতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা। ফুটবলে বড় দলকে চমকে দেওয়ার গল্প নতুন নয়, আর সেই গল্পের নতুন অধ্যায় লিখতে মরিয়া প্যারাগুয়ে।