
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও গতিশীল করতে চট্টগ্রামকে জাতীয় ও আঞ্চলিক লজিস্টিক্যাল হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে নতুন বন্দর নির্মাণ, কর্ণফুলী নদীর ওপারে ফ্রি জোন প্রতিষ্ঠা, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মতো একাধিক উদ্যোগ বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
শনিবার (৪ জুলাই) চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপের সময় তিনি সরকারের এই পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। সফরের শুরুতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন অর্থমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রবন্দর এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উপযোগী যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে চট্টগ্রামের সম্ভাবনা দেশের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রামকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়েই সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
তিনি জানান, কর্ণফুলী নদীর ওপারে প্রায় ৬০০ একর জমিতে একটি ফ্রি জোন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামে একাধিক নতুন বন্দর নির্মাণ, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে উন্নীত করা এবং একটি চাইনিজ ইকোনমিক জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনাও সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নতুন অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। কারণ বর্তমান সরকার এমন একটি অর্থনীতি পেয়েছে, যা বিভিন্ন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলছে।
তিনি বলেন, সরকারের প্রথম লক্ষ্য অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। এরপর সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা হবে। সরকারের ধারণা, বর্তমান মেয়াদের তৃতীয় ও চতুর্থ বছরে এসব উদ্যোগের সুফল আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হবে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সম্ভাবনাকে বিবেচনায় রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে। যে অঞ্চলের যে ধরনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা রয়েছে, সেটিকে কাজে লাগানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আঞ্চলিক উন্নয়ন যেমন ত্বরান্বিত হবে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসবে।
যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের লাকসাম অংশের উন্নয়ন সম্পন্ন হলে ট্রেনে যাতায়াতের সময় প্রায় দুই ঘণ্টা কমে আসবে বলে জানান তিনি। এতে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনও আরও দ্রুত ও সাশ্রয়ী হবে।
তিনি বলেন, এসব অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক করিডর গড়ে উঠবে। এর মাধ্যমে দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়বে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে।
মাতারবাড়িকে ঘিরেও সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই অঞ্চলকে ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে।
সরকারের বৃহত্তর অর্থনৈতিক লক্ষ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সম্ভাবনার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাবে। সরকারের বিভিন্ন নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা সেই দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বাস্তবায়নের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।