
লালমনিরহাটে ‘আলোকিত লালমনিরহাট’ কমিটির উদ্যোগে সাত জোড়া তরুণ-তরুণীর যৌতুকবিহীন গণবিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।
Article (600–700 words):
সন্ধ্যা গড়াতেই একে একে অতিথিরা আসতে শুরু করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই লালমনিরহাট জেলা পরিষদ অডিটোরিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। বর-কনের স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী আর আমন্ত্রিত অতিথিদের পদচারণায় পুরো পরিবেশ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। সবার দৃষ্টি তখন মঞ্চের দিকে, যেখানে একে একে আসন গ্রহণ করেন সাতজন বর ও সাতজন কনে। এরপর শুরু হয় এক ব্যতিক্রমী বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা।
লোকসংগীত আর ঐতিহ্যবাহী আবহে সাজানো এই আয়োজন ছিল শুধু একটি বিয়ে নয়, বরং যৌতুকবিরোধী সামাজিক বার্তার এক শক্তিশালী প্রকাশ। স্থানীয় শিল্পীরা পরিবেশন করেন রংপুর অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বিয়ের গীত। করতালি, আনন্দ আর শুভকামনার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় সাত জোড়া নবদম্পতির যৌতুকমুক্ত বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। পুরো অডিটোরিয়াম যেন পরিণত হয় এক উৎসবমুখর মিলনমেলায়।
সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধ এবং যৌতুকমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে শুক্রবার (৩ জুলাই) রাতে এই ব্যতিক্রমী গণবিয়ের আয়োজন করে ‘আলোকিত লালমনিরহাট’ কমিটি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তাঁর উপস্থিতি আয়োজনটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
আয়োজকরা জানান, লালমনিরহাট সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের এই সাত জোড়া তরুণ-তরুণীর বিয়ের যাবতীয় খরচ বহন করেছে আলোকিত লালমনিরহাট কমিটি। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা থেকে শুরু করে অতিথি আপ্যায়ন, সবকিছুই ছিল সংগঠনের পক্ষ থেকে। ফলে নবদম্পতি ও তাদের পরিবারকে কোনো আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হয়নি।
যৌতুক ছাড়া বিয়ে করতে পেরে আনন্দ প্রকাশ করে বর আলমগীর হোসেন বলেন, যৌতুক ছাড়া বিয়ে করতে পেরে আমি গর্বিত। আমরা চাই সমাজ থেকে এই কুপ্রথা চিরতরে বিদায় নিক। যৌতুকবিহীন সংসারে পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসা বেশি থাকবে বলেই আমি বিশ্বাস করি। তাঁর এই বক্তব্য উপস্থিত অনেকের মন ছুঁয়ে যায়।
তার স্ত্রী তামান্না খাতুন বলেন, আমার বাবা-মাকে বিয়ের জন্য একটি টাকাও খরচ করতে হয়নি। এত সুন্দর আয়োজনে আমার বিয়ে হবে, তা কখনো ভাবিনি। এটি আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে। তাঁর কণ্ঠে ছিল আনন্দ, কৃতজ্ঞতা আর নতুন জীবনের স্বপ্ন।
স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের আয়োজন শুধু কয়েকটি পরিবারের জন্য সহায়তা নয়, বরং সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেয়। যৌতুকপ্রথা এখনো দেশের অনেক এলাকায় সামাজিক ব্যাধি হিসেবে রয়ে গেছে। দরিদ্র পরিবারগুলোকে এই প্রথার কারণে নানা ধরনের চাপ ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়। এমন পরিস্থিতিতে যৌতুকবিহীন গণবিয়ের আয়োজন নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরাও এ ধরনের সামাজিক উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তারা বলেন, যৌতুকমুক্ত বিয়ে শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি একটি মানসিক পরিবর্তনের সূচনা। সমাজে যদি এমন উদ্যোগ নিয়মিত হয়, তাহলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যৌতুকবিরোধী সচেতনতা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে বিয়েকে কেন্দ্র করে পরিবারগুলোর আর্থিক চাপও কমবে।
‘আলোকিত লালমনিরহাট’ কমিটির এই আয়োজন স্থানীয়ভাবে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু লালমনিরহাট নয়, দেশের অন্যান্য জেলাতেও অনুসরণ করা যেতে পারে। কারণ, সামাজিক পরিবর্তন আনতে হলে শুধু আইন নয়, প্রয়োজন জনসম্পৃক্ত ইতিবাচক উদ্যোগও।
সব মিলিয়ে, লালমনিরহাটের এই গণবিয়ে ছিল আনন্দ, ঐতিহ্য আর সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য সংমিশ্রণ। সাত জোড়া তরুণ-তরুণীর নতুন জীবনের শুরু যেমন ছিল উৎসবমুখর, তেমনি যৌতুকবিরোধী এই আয়োজন সমাজে একটি শক্তিশালী বার্তাও পৌঁছে দিয়েছে—বিয়ে হোক ভালোবাসা ও সম্মানের, লেনদেনের নয়।