
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে আয়োজিত জাতীয় সম্মেলনে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় শহীদ পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণে। সন্তানের আত্মত্যাগের বর্ণনা শুনে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শহীদ জননীর হৃদয়স্পর্শী বক্তব্যে মিলনায়তনে উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
শনিবার (৪ জুলাই) সকাল ১০টায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র) ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’ ও স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। ‘৩৬ জুলাই’ অর্থাৎ ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ ও ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’।
অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই পরিবেশ ছিল গম্ভীর ও আবেগময়। মঞ্চে একে একে উঠে আসেন গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো কয়েকজন শহীদের পরিবারের সদস্যরা। তারা তাদের সন্তান, ভাই, স্বামী কিংবা স্বজনকে হারানোর বেদনা, সংগ্রাম এবং স্মৃতির কথা তুলে ধরেন। দীর্ঘদিনের জমে থাকা কষ্ট, শূন্যতা আর অপূর্ণতার কথা বলতে গিয়ে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এক শহীদ জননী যখন তার সন্তানের আত্মত্যাগের কথা বলতে শুরু করেন, তখন পুরো মিলনায়তনে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। তার কণ্ঠে ছিল শোক, গর্ব আর বেদনার মিশ্র অনুভূতি। সন্তান হারানোর যন্ত্রণা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বারবার থেমে যান। শেষ পর্যন্ত কান্নায় ভেঙে পড়লে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যেও আবেগ ছড়িয়ে পড়ে।
সামনের সারিতে বসা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সেই আবেগ সামলাতে পারেননি। শহীদ জননীর বক্তব্য শুনে তার চোখে পানি চলে আসে। দু’চোখে পানি টলমল করতে দেখা যায় তাকে। উপস্থিত অনেকেই এ দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। মুহূর্তটি পুরো সম্মেলনকে এক গভীর মানবিক আবহে রূপ দেয়।
শহীদ পরিবারের সদস্যরা তাদের বক্তব্যে শুধু শোকই নয়, বরং আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, জুলাইয়ের শহীদরা দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্মৃতি যেন কখনো মুছে না যায়, সে আহ্বানও জানান তারা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্য শহীদ পরিবারের সদস্যরাও একে একে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। কেউ হারিয়েছেন সন্তান, কেউ ভাই, কেউ বা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে। তবু তাদের কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা। তারা জানান, প্রিয়জন হারানোর বেদনা সত্ত্বেও তারা চান, দেশের মানুষ জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে মনে রাখুক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিক।
আয়োজকরা জানান, ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ ও ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করেছে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যে। দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির এই আয়োজনকে তারা শুধু স্মরণসভা নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে দেখছেন।
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই আন্দোলনে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ জাতির জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। শহীদ পরিবারের কান্না ও স্মৃতিচারণ সেই ইতিহাসকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে, জুলাই জাতীয় সম্মেলন পরিণত হয় এক আবেগঘন স্মরণানুষ্ঠানে। শহীদ জননীর কান্না, পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণ এবং প্রধানমন্ত্রীর অশ্রুসিক্ত প্রতিক্রিয়া—সবকিছু মিলিয়ে দিনটি উপস্থিত সবার মনে গভীর ছাপ ফেলে। জুলাইয়ের শহীদদের স্মৃতি যে কেবল ইতিহাস নয়, বরং জীবন্ত অনুভূতি, সেই বার্তাই যেন আরও একবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই সম্মেলনে।