
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এটি হতে যাচ্ছে প্রথম জাতীয় নির্বাচন—যার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে এবার বড় পরিসরে সক্রিয় হচ্ছেন বিদেশি পর্যবেক্ষকরা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য গত মঙ্গলবার ৩০টি বিদেশি রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি চারটি আন্তর্জাতিক সংস্থাকেও চিঠি পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ইতোমধ্যে ১৭৭ সদস্যের একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে এটিই ইইউর প্রথম পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন।
ইইউ সূত্র অনুযায়ী, ভোটের সময় ঘনিয়ে এলে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আরও সাতজন সদস্য বাংলাদেশে আসবেন। তারা মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও নির্বাচনী পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করবেন এবং মূল মিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন।
এই পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভার্স ইজাবস। তিনি আগামী ৮ জানুয়ারি ঢাকায় এসে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সেদিনই বিকেলে সিইসির সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে ইইউ মিশনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। ইভার্স ইজাবস ১২ জানুয়ারি দেশে ফিরে গেলেও ভোটের আগে আবার বাংলাদেশে আসবেন।
ইইউ জানিয়েছে, তাদের মিশন পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করবে। পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম ধাপে ধাপে পরিচালিত হবে। প্রথম ধাপে আসবেন ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক, যারা নির্বাচনী প্রস্তুতি, ভোটার তালিকা, প্রচারণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন। পরবর্তী ধাপে যুক্ত হবেন ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যবেক্ষকরাও বিদেশি মিশনের সঙ্গে কাজ করবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিদেশি পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি নির্বাচনকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে প্রথম নির্বাচন হওয়ায় দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আস্থার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ কারণে সরকার চায়, পর্যবেক্ষক উপস্থিতি যতটা সম্ভব বিস্তৃত হোক।
ইইউসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নির্বাচনের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে সরকারের অবস্থান হলো—কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। এ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রতিবেদনে কীভাবে প্রতিফলিত হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কূটনৈতিক কর্মকর্তা জানান, ইইউ পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটার অংশগ্রহণ, প্রচারণা পরিবেশ, ভোটগ্রহণ ও ফল ঘোষণার প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করবেন। এতে অতীতে ওঠা ভোট কারচুপি বা হস্তক্ষেপের অভিযোগ কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইইউ বাংলাদেশের একটি বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হওয়ায় তাদের পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রতিবেদন কেবল রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হলে আন্তর্জাতিক আস্থা বাড়বে এবং বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের পথ সুগম হতে পারে। তবে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু একটি ভোটগ্রহণ নয়—এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের সক্রিয় উপস্থিতি এই প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করে তুলবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।