
মানুষের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য ইসলাম এমন কিছু মৌলিক নীতিমালা দিয়েছে, যা যুগে যুগে মুসলমানদের জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় পবিত্র মসজিদে নববির জুমার খুতবায় যুবসমাজের উদ্দেশে হৃদয়স্পর্শী বক্তব্য দিয়েছেন মসজিদে নববির সম্মানিত ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আলী বিন আব্দুর রহমান আল-হুজাইফি।
খুতবার শুরুতেই তিনি সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে উদ্দেশ করে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দেওয়া একটি বিখ্যাত হাদিস স্মরণ করিয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই উপদেশে একজন মুসলমানের জীবন পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চললে আল্লাহ তাঁর বান্দাকে হেফাজত করেন এবং সর্বাবস্থায় তাঁর সাহায্য ও অনুগ্রহ লাভের সুযোগ করে দেন।
শায়খ আল-হুজাইফি ব্যাখ্যা করেন, ‘আল্লাহকে রক্ষা করো’—এই কথার অর্থ হলো আল্লাহর নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করা, তাঁর নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকা এবং ইসলামের সীমারেখাকে সম্মান করা। যে ব্যক্তি এভাবে জীবন পরিচালনা করে, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে নিরাপত্তা, কল্যাণ এবং সফলতা দান করেন।
এ সময় তিনি পবিত্র কোরআনের সেই সুসংবাদের কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছে—যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সৎকর্ম করবে, আল্লাহ তাকে পবিত্র ও সুন্দর জীবন দান করবেন এবং তার উত্তম কর্মের সর্বোত্তম প্রতিদান প্রদান করবেন। পাশাপাশি তিনি আল্লাহভীতির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য কঠিন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ সহজ করে দেন এবং এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা তার কল্পনারও বাইরে।
খুতবায় তিনি আরও বলেন, তাকওয়ার সুফল শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তার পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এর বরকত লাভ করে। এ প্রসঙ্গে তিনি সুরা কাহফে বর্ণিত দুই এতিম শিশুর ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে তাদের নেককার পিতার কারণে আল্লাহ তাদের সম্পদ সংরক্ষণ করেছিলেন। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি বলেন, একজন অভিভাবকের নেক আমল তার সন্তানদের জন্যও রহমত ও নিরাপত্তার কারণ হতে পারে।
ইসলামের অন্যতম প্রধান ইবাদত নামাজের গুরুত্বও খুতবায় বিশেষভাবে তুলে ধরেন শায়খ আল-হুজাইফি। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি নামাজের রুকন, শর্ত ও খুশু-খুজু যথাযথভাবে রক্ষা করে, তার জন্য অন্যান্য ইবাদত ও ইসলামী বিধান অনুসরণ করাও সহজ হয়ে যায়। একই সঙ্গে তিনি দৃষ্টি সংযত রাখা, লজ্জাস্থানের হেফাজত করা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গুনাহ থেকে বিরত রাখা এবং ইসলামী শিষ্টাচার মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণীর ব্যাখ্যায় বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যে জীবন পরিচালনা করে, আল্লাহ তার প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ করেন। তিনি তাকে সঠিক পথ দেখান, বিপদের সময় সাহায্য করেন, শত্রুর মোকাবিলায় শক্তি দেন এবং সর্বাবস্থায় নিজের রহমত ও তত্ত্বাবধানে রাখেন। তাই একজন মুমিনের জীবনে বিপদ-আপদ এলেও ধৈর্য ধারণ ও আল্লাহর প্রতিদানের আশা রাখা উচিত। এতে সেই কষ্টই গুনাহ মাফ এবং মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
খুতবার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশজুড়ে তিনি তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একজন প্রকৃত মুসলমান সব প্রয়োজন ও সাহায্যের জন্য সর্বপ্রথম আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করে। কারণ প্রকৃত উপকার ও ক্ষতির মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাই এমন বিষয়ে কোনো সৃষ্টির কাছে সাহায্য চাওয়া, যা একমাত্র আল্লাহই করতে সক্ষম, তা ইসলামের দৃষ্টিতে শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
খুতবার শেষাংশে শায়খ আল-হুজাইফি তাকদিরের প্রতি দৃঢ় ঈমানের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষ চেষ্টা-প্রচেষ্টা ছেড়ে দেবে। বরং একজন মুমিন সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে বৈধ উপায় অবলম্বন করবে এবং ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখবে। এ ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই ইসলামে প্রকৃত তাওয়াক্কুলের শিক্ষা।