
টাঙ্গাইল শহরের এনায়েতপুর এলাকায় এক শতবর্ষী অন্ধপ্রায় বৃদ্ধকে রাস্তায় ফেলে যাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর বৃদ্ধ মফিজ উদ্দিনের চিকিৎসা, ভরণপোষণ ও সার্বিক দেখভালের দায়িত্ব ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মফিজ উদ্দিন তিন ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। প্রায় আট বছর আগে তার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি পারিবারিক অবহেলার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছিলেন। এরই মধ্যে এক ছেলে মারা গেছেন, বড় ছেলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং ছোট ছেলে আলাদাভাবে বসবাস করেন। জীবনের শেষ সম্বল হিসেবে থাকা সম্পত্তিও দুই ছেলের নামে লিখে দেওয়ার পর তার অবস্থান আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে বলে স্থানীয়রা জানান।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসবাস করলেও নিয়মিত পরিচর্যার অভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বড় ছেলের বাড়িতে থাকার সময় ছেলের স্ত্রীর মৃত্যুর পর নাতনি ও তার স্বামীর কাছে তিনি পর্যাপ্ত যত্ন পাচ্ছিলেন না বলেও স্থানীয়দের দাবি।
অভিযোগ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বৃদ্ধকে বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে রাস্তার পাশে রেখে চলে যাওয়া হয়। বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে এলে প্রশাসনকে জানানো হয়। পরে প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর নির্দেশে গভীর রাতে টাঙ্গাইল সদর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বৃদ্ধকে উদ্ধার করে। পরবর্তীতে তাকে তার ছোট মেয়ে রিনা বেগমের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়।
টাঙ্গাইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিন জানিয়েছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বৃদ্ধের নাতনিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযুক্ত তার স্বামী পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। বিষয়টি নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এ ঘটনার পর প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জানান, যতদিন প্রয়োজন হবে ততদিন তিনি ব্যক্তিগতভাবে মফিজ উদ্দিনের চিকিৎসা, থাকা-খাওয়া এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য ব্যয় বহন করবেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বৃদ্ধ ভাতার ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদি মেয়ের বাড়িতে দীর্ঘমেয়াদে থাকা সম্ভব না হয়, তাহলে তার জন্য বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থাও করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, একজন অসহায় বৃদ্ধকে এভাবে রাস্তায় ফেলে যাওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত দুঃখজনক ও অমানবিক। তিনি পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, বাবা-মা পরিবারের সবচেয়ে মূল্যবান আশীর্বাদ। তাদের সম্মান, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় যত্ন নিশ্চিত করা প্রত্যেক পরিবারের নৈতিক দায়িত্ব। অভিযোগের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।
ঘটনাটি স্থানীয় এলাকাতেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সচেতন নাগরিকরা পারিবারিক মূল্যবোধ ও প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ববোধের গুরুত্বের বিষয়টি সামনে এনে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। একই সঙ্গে অসহায় বৃদ্ধের পাশে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব গ্রহণের উদ্যোগকে মানবিক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তারা।
প্রবীণ নাগরিকদের নিরাপত্তা, সম্মান এবং পারিবারিক যত্ন নিশ্চিত করার বিষয়ে এই ঘটনা নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রবীণদের অধিকার ও নিরাপত্তা আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব।