
গোপন তথ্যদাতার পরিচয় প্রকাশে অস্বীকৃতি জানানোয় অনুসন্ধানী সাংবাদিক ক্যাথরিন হেরিজের জরুরি আবেদন খারিজ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। ফলে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তথ্যদাতার পরিচয় প্রকাশ না করা পর্যন্ত তাকে প্রতিদিন ৮০০ মার্কিন ডলার করে জরিমানা দিতে হবে।
বৃহস্পতিবার দেওয়া এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের দেওয়া জরিমানার আদেশ কার্যকর হওয়ার পথ সুগম হয়েছে। ক্যাথরিন হেরিজ দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য পরিচিত। ২০১৭ সালে ফক্স নিউজে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিন বিজ্ঞানী ইয়ানপিং চেনের সঙ্গে চীনের সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও উল্লেখ করা হয়, ভার্জিনিয়ায় চেন প্রতিষ্ঠিত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে তিনি চীনা সরকারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সদস্যদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করছিলেন কি না, তা এফবিআই তদন্ত করছিল। তবে দীর্ঘ তদন্তের পরও তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি।
পরে ইয়ানপিং চেন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও এফবিআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তার অভিযোগ ছিল, তদন্ত-সংক্রান্ত গোপন নথি ফাঁস হওয়ার কারণে সংবাদমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা শুরু হয়, যা তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে গুরুতর প্রভাব ফেলে। তিনি দাবি করেন, এ কারণে ঘৃণামূলক বার্তা ও প্রাণনাশের হুমকিরও মুখে পড়তে হয়েছে।
মামলার শুনানিতে চেনের আইনজীবীরা বলেন, হেরিজের প্রতিবেদনে এমন কিছু তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে, যা তদন্ত-সংক্রান্ত গোপন নথি থেকে ফাঁস হয়েছিল। এর মধ্যে এফবিআইয়ের সাক্ষাৎকারের সারসংক্ষেপ, ব্যক্তিগত ছবি, অভিবাসন-সংক্রান্ত নথি এবং অভ্যন্তরীণ উপস্থাপনার তথ্য ছিল। এসব তথ্য কে সরবরাহ করেছিলেন, তা জানতে আদালত সাংবাদিককে তার গোপন তথ্যদাতার পরিচয় প্রকাশের নির্দেশ দেয়।
ওয়াশিংটনের মার্কিন জেলা আদালতের বিচারক ক্রিস্টোফার কুপার রায়ে বলেন, নিজের মামলা পরিচালনার জন্য তথ্য ফাঁসকারীর পরিচয় জানার অধিকার চেনের রয়েছে এবং এই ক্ষেত্রে সেটি সাংবাদিকের তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখার অধিকারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আদালতের নির্দেশে শপথ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নিলেও ক্যাথরিন হেরিজ তার কোনো গোপন সূত্রের পরিচয় প্রকাশ করেননি। পরে আদালত তাকে দেওয়ানি আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে এবং প্রতিদিন ৮০০ ডলার জরিমানার নির্দেশ দেয়। আপিল আদালতও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। পরে তিনি সুপ্রিম কোর্টে জরুরি আবেদন করেন। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস সাময়িকভাবে জরিমানা স্থগিত রাখলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে সুপ্রিম কোর্ট সেই স্থগিতাদেশ তুলে নেয়। আদালতের তথ্যমতে, বিচারপতি ব্রেট ক্যাভানফ জরিমানা স্থগিত রাখার পক্ষে মত দিলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা তা সমর্থন করেননি।
এই সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছে ফক্স নিউজ মিডিয়া। এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, সাংবাদিকদের গোপন তথ্যদাতার পরিচয় রক্ষা এবং নিরাপদ সংবাদ সংগ্রহ একটি স্বাধীন ও কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তারা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর অধিকার রক্ষার লড়াই অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
এদিকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, সাংবাদিকদের যদি গোপন তথ্যদাতার পরিচয় প্রকাশে বাধ্য করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সরকারি অনিয়ম, দুর্নীতি বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশে আগ্রহী ব্যক্তিরা সাংবাদিকদের কাছে তথ্য দিতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
অন্যদিকে ইয়ানপিং চেনের আইনজীবীদের দাবি, তথ্য ফাঁসকারীর পরিচয় জানার জন্য তারা সম্ভাব্য সব আইনি পথ অনুসরণ করেছেন। তাদের মতে, প্রাইভেসি আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণ করতে তথ্যদাতার পরিচয় জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চেনের আইনজীবী অ্যান্ড্রু ফিলিপস বলেন, সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত মামলার নিষ্পত্তির পথ আরও সহজ করবে এবং ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের জন্য দায়ী সরকারি কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করার সুযোগ সৃষ্টি করবে।
বর্তমানে ক্যাথরিন হেরিজ স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন। এর আগে তিনি ফক্স নিউজ এবং সিবিএস নিউজে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। এই মামলাটি এখন যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকদের তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের ভারসাম্য নিয়ে অন্যতম আলোচিত আইনি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।