
উজানে ভারী বৃষ্টিপাত এবং বর্ষা মৌসুমের প্রভাবের কারণে চলতি বছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে দেশের ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)।
এফএফডব্লিউসির নির্বাহী প্রকৌশলী সারদার উদয় রায়হান জানান, জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশে জুলাই ও আগস্ট মাস সবসময়ই বন্যার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময়ে দেশের প্রধান নদীগুলোর উজান ও অববাহিকায় ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তিনি বলেন, এ কারণেই চলতি বছর ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী অববাহিকায় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। তবে পরিস্থিতি নির্ভর করবে উজানের বৃষ্টিপাত ও নদীর প্রবাহের ওপর।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এফএফডব্লিউসির সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী ব্যবস্থার পানির স্তর কিছুটা কমেছে। তবে আগামী চার দিনে নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি পেতে পারে এবং পঞ্চম দিনে তা স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ৪ থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও বগুড়া জেলার ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া আগামী পাঁচ দিনে গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানির স্তরও বাড়তে পারে। তবে তা বিপৎসীমার নিচেই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে আগামী ৭২ ঘণ্টায় সুরমা-কুশিয়ারা (উচ্চ মেঘনা) নদ-নদীর পানি সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানে সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে। ফলে এসব এলাকার নিম্নাঞ্চলে সাময়িক জলাবদ্ধতা বা প্লাবনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
বর্তমানে নীলফামারীর ডালিয়া, লালমনিরহাটের তারাপুর, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ, সুনামগঞ্জের মারকুলি, এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দা এলাকায় সংশ্লিষ্ট নদীগুলোর পানি ইতোমধ্যে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে।
সারদার উদয় রায়হান জানান, বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ নদী অববাহিকার জন্য ১০ থেকে ১৫ দিন আগে পর্যন্ত বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে উপকূলীয় নদীগুলোর ক্ষেত্রে নির্ভুলভাবে তিন দিন আগে পর্যন্ত পূর্বাভাস দেওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হলেও আগামী পাঁচ থেকে ছয় দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সময়ে উজানে ভারী বৃষ্টিপাত না হলে মেঘনা অববাহিকার অবস্থাও স্বাভাবিক থাকতে পারে।
এফএফডব্লিউসির পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, চলতি মাসে বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর প্রভাবে দেশের উপকূলীয় নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা বা জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের বন্যা ইতিহাসও এমন আশঙ্কার বাস্তবতা তুলে ধরে। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। ১৯৯৮ সালের দীর্ঘস্থায়ী বন্যা দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলেছিল, যাতে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং প্রায় ৩ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর একযোগে উচ্চ প্রবাহ দেখা দিলে বড় ধরনের বন্যার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। ২০০৪ সালের বন্যা তার অন্যতম উদাহরণ। সাম্প্রতিক ২০২২ ও ২০২৪ সালের বন্যাতেও এক কোটির বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যা উজানের অতিবৃষ্টি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করেছে।