
ইরান যুদ্ধের শুরুতে নিহত দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা আগামী ৪ জুলাই (শনিবার) থেকে শুরু হচ্ছে। ছয় দিনব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিকে তেহরানের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাবেশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন দেশটির কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে এটিকে জাতীয় ঐক্য এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে ইরানের অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
তেহরানের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আলিরেজা জাকানি জানিয়েছেন, সাবেক সর্বোচ্চ নেতার সম্মানে আয়োজিত এই কর্মসূচি রাজধানীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জনসমাবেশে পরিণত হতে পারে।
দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে মধ্য তেহরানে তার বাসভবন ও কার্যালয় এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। ওই হামলায় তার পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারান।
মূলত মার্চ মাসের শুরুতেই শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তা স্থগিত করা হয়। সম্প্রতি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কার্যকর হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর নতুন করে অনুষ্ঠানসূচি ঘোষণা করেছে ইরান সরকার।
শেষকৃত্য আয়োজন কমিটির প্রধান আলী-আকবর পুরজামশিদিয়ান বলেন, রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় সংহতি ও ঐক্য জোরদার করাই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার দেশে সরকার ব্যাপক জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে অনুষ্ঠান সফল করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
শনিবার থেকে তেহরানে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হবে। এ সময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। রাজধানীতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বড় ধরনের জনসমাগমের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৯ জুলাই খামেনিকে তার জন্মস্থান মাশহাদে দাফন করা হবে। এর আগে ৮ জুলাই তার কফিন ইরাকের শিয়া মুসলিমদের পবিত্র নগরী নজফ ও কারবালাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল প্রদক্ষিণ করবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই কর্মসূচি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ধর্মীয় ও আঞ্চলিক প্রভাবের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
খামেনির দীর্ঘ শাসনামলে একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের উত্তেজনা অব্যাহত ছিল, অন্যদিকে দুর্নীতি, অর্থনৈতিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশের ভেতরেও অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। এর ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সময়ে বড় ধরনের গণবিক্ষোভ দেখা দেয়, যার মধ্যে ২০০৯ সালের সবুজ আন্দোলন, ২০২২ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক দেশব্যাপী বিক্ষোভ উল্লেখযোগ্য।
সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রভাবে ইরানের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, শিল্প-কারখানা ধ্বংস এবং কর্মসংস্থানের সংকট তৈরি হয়েছে। এতে হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এবং তরুণদের মধ্যে হতাশা বেড়েছে।
তবে সরকারের সমর্থকদের মতে, এই রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য শুধু একজন নেতার বিদায় নয়, বরং জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হবে। তাদের দাবি, নানা সামরিক ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও রাষ্ট্রের টিকে থাকা ইরানের দৃঢ়তার বহিঃপ্রকাশ।