
বিশ্ব ফুটবলের দুই কিংবদন্তি, দুই ভিন্ন ধাঁচের শিল্পী। একজন গোল করে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন, অন্যজন নিখুঁত পাস, অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি ও খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দলের প্রাণ হয়ে ওঠেন। ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো ও লুকা মডরিচ—দুই তারকার এই ভিন্ন পরিচয়ই এবার বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইকে দিয়েছে বিশেষ মাত্রা।
পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার এই ম্যাচ শুধু নকআউট পর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ লড়াই নয়, এটি দুই অভিজ্ঞ তারকার সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ যাত্রারও একটি অধ্যায়। ম্যাচ শেষে দুই কিংবদন্তির একজনের বিশ্বকাপ স্বপ্ন থেমে যাবে, আর সেই কারণেই এই দ্বৈরথকে অনেকেই বলছেন ‘ওয়ান লাস্ট ডান্স’।
রোনালদো ও মডরিচ—দুজনেরই বয়স ৪০ বছরের বেশি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম ৪০ বছরের বেশি বয়সী দুই আউটফিল্ড ফুটবলার একই ম্যাচে মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায়। এর আগে এই বয়সে বিশ্বকাপে আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে অংশ নেওয়ার নজির ছিল কেবল ক্যামেরুনের কিংবদন্তি রজার মিলারের।
তবে বয়স বাড়লেও দুজনই এখনো নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে চলেছেন। রোনালদোর এবারের বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল সমালোচনার মধ্যে। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে প্রত্যাশিত ছন্দে দেখা যায়নি তাকে। পরে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে জবাব দিলেও কলম্বিয়ার বিপক্ষে আবারও নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
এসব সমালোচনার জবাবে রোনালদো জানিয়েছেন, দীর্ঘ পেশাদার ক্যারিয়ারে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি বহুবার হয়েছেন। তার মতে, খারাপ একটি ম্যাচের পরই অনেকে বলে বসেন তিনি শেষ হয়ে গেছেন বা বয়সের কারণে আর আগের মতো নেই। তবে তিনি এসব বাইরের আলোচনা নিয়ে বিচলিত নন এবং মাঠের পারফরম্যান্সেই জবাব দিতে চান।
অন্যদিকে মডরিচকে ঘিরে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম হলেও তিনিও বয়সজনিত প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে প্রত্যাশিত প্রভাব রাখতে না পারায় তাকে নির্ধারিত সময়ের আগেই মাঠ ছাড়তে হয়। কিন্তু পানামার বিপক্ষে নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন তিনি এবং ঘানার বিপক্ষে নিকোলা ভ্লাসিচের জয়সূচক গোলে দুর্দান্ত অ্যাসিস্ট করে আবারও দেখিয়ে দেন, বড় ম্যাচে তার সৃজনশীলতা এখনো অটুট।
মডরিচের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুধু পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়াকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে এবং ২০২২ সালে সেমিফাইনালে পৌঁছে দেওয়ার পেছনে তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। মাত্র ৪০ লাখ মানুষের একটি দেশকে ধারাবাহিকভাবে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে ধরে রাখতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
অন্যদিকে রোনালদোও আন্তর্জাতিক ফুটবলে অসংখ্য রেকর্ডের মালিক। গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা, নেতৃত্ব এবং বড় ম্যাচে নিজেকে প্রমাণ করার মানসিকতা তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের কাতারে জায়গা করে দিয়েছে।
এখন প্রশ্ন একটাই—শেষ ষোলোর এই মহারণে কার স্বপ্ন বেঁচে থাকবে? রোনালদো কি পর্তুগালকে নিয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবেন, নাকি মডরিচ আবারও ক্রোয়েশিয়াকে বড় মঞ্চে চমক দেখাবেন? উত্তর মিলবে মাঠের ৯০ মিনিটেই, তবে নিশ্চিতভাবেই ম্যাচটি বিশ্বকাপের অন্যতম আবেগঘন লড়াই হয়ে থাকবে।