
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে এক কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় জন্ম নেওয়া শিশুর জৈবিক পিতা হিসেবে অভিযুক্ত কিশোরের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে ১০ বছরের আটকাদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুটিকে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সন্তান হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া এবং ভুক্তভোগীর জন্য ভরণপোষণের অর্থ নির্ধারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) চট্টগ্রামের শিশু আদালত-২-এর বিচারক, জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ সাইফুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত কিশোরকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে কারাগারে তাকে অন্য বন্দিদের থেকে পৃথক ওয়ার্ডে রাখার নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।
মামলার বিবরণী অনুযায়ী, ২০২১ সালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার একটি এলাকায় অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে তার নিজ ঘরে ছুরির ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করে প্রতিবেশী এক কিশোর। ঘটনার সময় অভিযুক্তের বয়স ১৮ বছরের কিছু কম হওয়ায় সেও আইনের দৃষ্টিতে শিশু হিসেবে বিবেচিত হয়।
ধর্ষণের ফলে ভুক্তভোগী কিশোরী গর্ভবতী হন এবং পরবর্তীতে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। তবে জন্মের প্রায় দেড় বছর পর শিশুটি মারা যায়।
বিচার চলাকালে আদালতের নির্দেশে অভিযুক্ত, ভুক্তভোগী এবং মৃত শিশুর রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের জাতীয় ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়।
ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়, অভিযুক্ত কিশোরই মৃত শিশুটির জৈবিক পিতা। এই বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে আদালতে উপস্থাপিত হয়।
রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, অপরাধটি অত্যন্ত গুরুতর হলেও ঘটনার সময় অভিযুক্ত শিশু হওয়ায় তার বিচার হয়েছে শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী।
আইনের ৩৪(১) ধারা অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধে কোনো শিশুকে শিশু আদালত সর্বনিম্ন ৩ বছর এবং সর্বোচ্চ ১০ বছরের আটকাদেশ দিতে পারেন। সেই বিধান অনুসারেই অভিযুক্তকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া শিশু আইন, ২০১৩-এর ৩৪(৫) ধারা অনুযায়ী, বিচার শেষে যদি দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি ইতোমধ্যে ১৮ বছর অতিক্রম করে, তাহলে তাকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে নয়, কারাগারে পাঠানো যায়। যেহেতু রায় ঘোষণার সময় অভিযুক্ত প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেছে, তাই আদালত তাকে সরাসরি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তাকে অন্য বন্দিদের থেকে পৃথক ওয়ার্ডে রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়।
রায়ে আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৩(১)(খ) ধারা প্রয়োগ করে ঘোষণা করেন, ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া মৃত শিশুটি দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সন্তান হিসেবে আইনগত পরিচয়ের অধিকারী এবং সরকারি নথিপত্রেও সে পরিচয় বহাল থাকবে।
আদালতের মতে, ধর্ষণের শিকার কোনো নারীর গর্ভে জন্ম নেওয়া শিশুর পরিচয় নিয়ে সামাজিক বা আইনি অনিশ্চয়তা দূর করতে আইন এ অধিকার নিশ্চিত করেছে।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৩(২) ধারা অনুযায়ী সন্তানের ভরণপোষণের অর্থের পরিমাণ সরকার বিধি দ্বারা নির্ধারণ করবে। আর ১৩(৩) ধারা অনুসারে, প্রয়োজনে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির ভবিষ্যতে অর্জিত সম্পদ থেকেও সেই অর্থ আদায় করা যাবে।
তবে ভরণপোষণের নির্দিষ্ট অর্থ নির্ধারণ আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে নয় বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ কারণে জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রামকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তিনি যেন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে আইন অনুযায়ী ভরণপোষণের অর্থ নির্ধারণ ও আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং নির্ধারিত অর্থ ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন।
আইনজীবীদের মতে, এ রায়ে একদিকে যেমন ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুর পিতৃত্ব আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, অন্যদিকে শিশু আইনের আওতায় অভিযুক্তের বয়স বিবেচনা করে দণ্ড নির্ধারণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৩ ধারার বিধান অনুসারে শিশুর পরিচয় ও ভরণপোষণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে এটি ভবিষ্যতে একই ধরনের মামলায় গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।