
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদীর তীব্র ভাঙনে নতুন করে মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক দিনের ভাঙনে অন্তত ৭০টি পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়েছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, পাশের চর কিংবা উঁচু স্থানে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয়দের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আরও দুই শতাধিক পরিবার ভাঙনের কবলে পড়তে পারে।
চিলমারী ইউনিয়নের চর কড়াইবরিশাল, বিশারপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প ও চর শাখাহাটি এলাকায় নদীভাঙনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। ভাঙনের ফলে বসতভিটার পাশাপাশি কয়েক হেক্টর ফসলি জমি, গাছপালা, প্রায় ৩০০ মিটার হেরিং সড়ক এবং কয়েকটি বিদ্যুতের খুঁটি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
ভাঙনকবলিত বাসিন্দাদের মধ্যে অনেকেই বছরের পর বছর ধরে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হচ্ছেন। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা মমেনা বেগম জানান, জীবনে বহুবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে তিনি বসতভিটা, কৃষিজমি ও গবাদিপশু হারিয়েছেন। বর্তমানে জীবনের শেষ আশ্রয়টুকুও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় সচ্ছল সংসার থাকলেও এখন নিত্যদিনের জীবনযাপনই কঠিন হয়ে উঠেছে।
একই এলাকার আরও কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা জানান, একাধিকবার নতুন করে ঘর নির্মাণ করলেও কয়েক মাস বা কয়েক বছরের ব্যবধানে আবারও নদী তা কেড়ে নেয়। কেউ কেউ অন্য চরে অস্থায়ীভাবে জমি ভাড়া বা চুক্তিতে নিয়ে বসবাসের চেষ্টা করছেন। তবে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, শুধু বসতভিটাই নয়, নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে চর কড়াইবরিশাল নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, এক নম্বর চিলমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর শাখাহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঢুষমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কড়াইবরিশাল বাজার, চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, ইউনিয়ন ভূমি অফিস, নির্মাণাধীন বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, মসজিদ, মাদরাসাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ফলে ভাঙন অব্যাহত থাকলে জনজীবন ও শিক্ষা কার্যক্রমেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা এখনও দৃশ্যমান নয়। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা জানানো হলেও বাস্তবে ভাঙনরোধে পর্যাপ্ত উদ্যোগ দেখা যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে এবং ঝুঁকিতে রয়েছে আরও প্রায় ২০০টি পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা ও ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলাম জানান, জেলায় প্রায় ৪০টি স্থানে নদীভাঙন শুরু হয়েছে। চরাঞ্চলের জন্য আলাদা বরাদ্দ না থাকলেও সীমিত পরিসরে জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় স্থানে তা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে শুকনো খাবার ও জিআর চাল বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব পরিবার ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সহায়তা করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।