
কম্বোডিয়ার বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে উদ্ধার হওয়া আরও ১০৯ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাত ১টা ২৫ মিনিটে থাই এয়ারওয়েজের টিজি-৩৩৯ ফ্লাইটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। এর মাধ্যমে গত চার দিনে দেশে ফেরার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৬২ জন এবং পুরো জুন মাসে কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন মোট ৫৮৩ বাংলাদেশি।
দেশে ফেরার পর প্রত্যেক ভুক্তভোগীকে বিমানবন্দরে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি, প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক এবং ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের যৌথ উদ্যোগে জরুরি সহায়তা, মানসিক কাউন্সেলিং এবং নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছানোর জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের একজন জানান, একটি রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালাল চক্র তাকে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কম্বোডিয়ায় পাঠায়। এ জন্য তার কাছ থেকে ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা নেওয়া হয় এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর ছাড়পত্রও সংগ্রহ করা হয়। তবে কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তাকে মাত্র এক মাসের ভিজিট ভিসা দেওয়া হয় এবং প্রতিশ্রুত চাকরি না দিয়ে দালালদের মাধ্যমে একটি সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
আরেক ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে তাদের বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হতো। নির্ধারিত টার্গেট পূরণ করতে না পারলে মারধর, শারীরিক নির্যাতন এমনকি বৈদ্যুতিক শকও দেওয়া হতো। স্ক্যাম কম্পাউন্ডের ভেতরে নির্যাতনের জন্য আলাদা টর্চার সেলের ব্যবস্থাও ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সম্প্রতি কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় স্ক্যাম চক্রের সদস্যরা পালিয়ে গেলে সেখানে আটক থাকা অনেক বাংলাদেশি মুক্তি পান। পরে বিভিন্ন ধাপে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, সাইবার স্ক্যাম বর্তমানে মানবপাচারের একটি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। উন্নত দেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের বিদেশে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রের মুখে বা জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণার কাজে নিয়োজিত করা হচ্ছে।
তিনি জানান, জুন মাসে ৫৮৩ বাংলাদেশির দেশে ফেরা প্রমাণ করে যে বিপুল সংখ্যক মানুষ এই আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের শিকার হয়েছেন। দেশে ফিরে আসা অনেক ভুক্তভোগী ইতোমধ্যে মামলা করেছেন। তিনি দালাল, রিক্রুটিং এজেন্সি এবং আন্তর্জাতিক পাচারচক্রকে শনাক্ত করে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কম্বোডিয়ায় গেছেন। তবে দেশে ফেরা ব্যক্তিদের দাবি, এখনো হাজার হাজার বাংলাদেশি বিভিন্ন স্ক্যাম কম্পাউন্ডে আটকা পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, জুন মাসে দেশে ফেরা অনেকের কাছেই বিএমইটির বৈধ ছাড়পত্র ছিল। এর আগে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মায়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে ৮ জন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আরও ১৮ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছিলেন। তাদেরও ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে থাইল্যান্ড সীমান্ত হয়ে মায়ানমারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক সাইবার প্রতারণার কাজে লাগানো হয়।
ব্র্যাক জানিয়েছে, কম্পিউটার অপারেটর, কল সেন্টার এক্সিকিউটিভ, কাস্টমার সার্ভিসসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় পদের চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে ভুয়া ওয়েবসাইট, ই-মেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের টার্গেট করা হয়। পরে বিদেশে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হয়।
এ কারণে থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মায়ানমার, লাওস ও ভিয়েতনামে চাকরির উদ্দেশ্যে যাওয়ার আগে চাকরির সত্যতা, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বৈধতা এবং ভিসার ধরন সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ব্র্যাক।