
ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলায় মানবিক সহায়তা ও উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করতে ব্যাপক সামরিক সহায়তা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ভেতরে বর্তমানে ৯০০-র বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি ক্যারিবীয় অঞ্চলের পুয়ের্তো রিকো ও কুরাসাওয়ে আরও প্রায় ৮০০ সেনা অবস্থান করছে, যারা ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তা দিচ্ছেন।
লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ফ্রান্সিস ডোনোভান রয়টার্সকে জানান, গত সপ্তাহের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পরপরই অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান, বিমানবন্দর সচল করা এবং দুর্গত এলাকায় দ্রুত মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে বিমান ও নৌবাহিনীর বিভিন্ন সক্ষমতা কাজে লাগানো হয়েছে।
ত্রাণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার আকাশে অন্তত চার থেকে পাঁচটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন মোতায়েন করেছে। মিয়ামিতে অবস্থিত একটি সমন্বয়কেন্দ্র থেকে পরিচালিত এসব ড্রোনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তথ্য সংগ্রহ করে তা ভেনেজুয়েলার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে। ড্রোনের সহায়তায় কোন সড়ক চলাচলের উপযোগী রয়েছে, কোথায় ভবন ধসে পড়েছে এবং কোন এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা বেশি প্রয়োজন—এসব তথ্য দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
জেনারেল ডোনোভান জানান, সাধারণত আঞ্চলিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত সামরিক প্রযুক্তিই এবার মানবিক সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আকাশ থেকে সংগৃহীত তথ্য অনেক ক্ষেত্রে মাটিতে অবস্থানরত উদ্ধারকারীদের পক্ষে দেখা সম্ভব হয় না। ফলে উদ্ধার কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে।
এদিকে, চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে পরিচালিত মার্কিন অভিযানের পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় আসে। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের এই সামরিক উপস্থিতির একমাত্র উদ্দেশ্য মানবিক সহায়তা এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় সহযোগিতা করা।
গত মাসে ভেনেজুয়েলার কারাগারভিত্তিক গ্যাং ‘ট্রেন দে আরাগুয়া’-এর নেতাকে লক্ষ্য করে পরিচালিত একটি সামরিক অভিযানে দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় হয়েছিল। বর্তমান ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও সেই সমন্বয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
গত বুধবার এক মিনিটেরও কম সময়ের ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে ভেনেজুয়েলায়। এতে বহু ভবন ধসে পড়ে এবং হাজার হাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন। উদ্ধার অভিযানের ষষ্ঠ দিন পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে মাত্র একজন জীবিতকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির জাতীয় পরিষদের প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ। উদ্ধার হওয়া শিশুটির বয়স মাত্র তিন বছর। যদিও উদ্ধার অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ভূমিকম্পের পর মার্কিন মেরিন সদস্যরাই প্রথম ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয় উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে অনুসন্ধান অভিযান শুরু করেন। পাশাপাশি উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বিমান পরিবহন সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে। ভার্জিনিয়ার ফেয়ারফ্যাক্স থেকে আসা একটি উদ্ধারকারী দল সম্প্রতি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক মা ও তার নয় মাস বয়সী শিশুকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনাও প্রকাশ করেছে।
অন্যদিকে, দুর্যোগের পর দ্রুত ভারী যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করতে না পারায় ভেনেজুয়েলা সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রথম কয়েক দিনে অনেক বাসিন্দাকে নিজেদের হাত, কোদাল ও দড়ি ব্যবহার করে স্বজনদের খোঁজ করতে দেখা গেছে। পরে ভারী নির্মাণযন্ত্র ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু হয় এবং বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলোও মরদেহ ও জীবিত ব্যক্তিদের উদ্ধারে সহায়তা করে।
জেনারেল ডোনোভান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জীবনরক্ষাকারী ত্রাণসামগ্রী দ্রুত দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তিনি স্পষ্ট করেছেন, মানবিক সহায়তার কাজ শেষ হলে মার্কিন সেনারা ভেনেজুয়েলা ছেড়ে চলে যাবেন এবং দীর্ঘমেয়াদে সেখানে অবস্থান করার কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে এই যৌথ ত্রাণ কার্যক্রম ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সামরিক সম্পর্ক উন্নয়নের একটি ইতিবাচক সুযোগ তৈরি করতে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।