
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভেতরে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই দলটির ভেতরের একটি বড় অংশ অভিযোগ তুলেছে, এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দলীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
দলীয় সূত্র জানায়, নির্বাহী কাউন্সিলের বৈঠকের মাধ্যমে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা সাধারণ সভায় আলোচনা করা হয়নি। এতে দলের ভেতরে ‘মতামত উপেক্ষিত হওয়ার’ ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেক নেতা-কর্মী এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পদত্যাগের কথা ভাবছেন বলেও জানা গেছে।
এরই মধ্যে এই অস্থিরতার দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। গতকাল ফেসবুক পোস্টে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা দল থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে ঢাকা-৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানান। পাশাপাশি তিনি দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পদত্যাগপত্রও পাঠিয়েছেন।
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উশ সালেহিন বলেন, তাসনিম জারা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পদত্যাগের কথা জানিয়ে টেক্সট করেছেন এবং আহ্বায়কের কাছে পদত্যাগপত্র দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
২৫ ডিসেম্বর এনসিপির নির্বাহী কাউন্সিলের বৈঠকে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরদিন জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে একসঙ্গে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার কথা রয়েছে।
তবে দলের একটি বড় অংশ বলছে, নির্বাহী কাউন্সিলের বৈঠকেও সদস্যদের উল্লেখযোগ্য অংশ অনুপস্থিত ছিলেন। মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিশে বৈঠক ডাকা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা। তাঁদের মতে, এ ধরনের বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এভাবে নেওয়া দলীয় গণতন্ত্রের পরিপন্থী।
এই প্রেক্ষাপটে গতকাল এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন সদস্য জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচন না করার দাবি জানিয়ে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন। স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, নির্বাহী কমিটি ও তৃণমূল পর্যায়ে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দলের নারীনেত্রীদের একটি বড় অংশও জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। নির্বাহী কাউন্সিলের অন্তত ছয়জন নারী সদস্য আহ্বায়ককে জানিয়ে দিয়েছেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট হলে তাঁরা এনসিপির প্রার্থী হবেন না। যদিও পরবর্তীতে কয়েকজন ‘দলীয় স্বার্থে’ অবস্থান পরিবর্তন করেছেন।
দলীয় সূত্র বলছে, এনসিপির একাংশ শুরু থেকেই এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। তবে আরেকটি অংশ সংসদে আসন পাওয়ার বাস্তবতা বিবেচনায় জামায়াতের মতো প্রতিষ্ঠিত দলের সঙ্গে সমঝোতাকে সমর্থন করছেন। এই দুই অবস্থানের দ্বন্দ্বেই দলটির ভেতরে অস্থিরতা তীব্র হয়েছে।
এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি, বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থ এবং সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে তৃণমূল ও মধ্যম সারির নেতাদের বড় একটি অংশ এখনো সন্তুষ্ট নন।
এদিকে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতাকে কেন্দ্র করে এনসিপি নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক সংস্কার জোটও চাপের মুখে পড়েছে। জোটের অন্যতম শরিক রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন প্রকাশ্যে জানিয়েছে, তারা জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে কোনো নির্বাচনে যাবে না।
সব মিলিয়ে, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার সিদ্ধান্ত এনসিপির ভেতরে ও বাইরে নতুন রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে, যার প্রভাব নির্বাচনের মাঠে কীভাবে পড়বে—সেদিকেই এখন তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।