
এলপি গ্যাসের বাজারে সিন্ডিকেট ভেঙে সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে সারা দেশে দফায় দফায় অভিযান চালাচ্ছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন। সম্প্রতি বাজারে এলপি গ্যাসের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগে ভোক্তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। এ অবস্থায় দেশজুড়ে শত শত অভিযোগ পাওয়ার পর প্রশাসন মাঠে নামে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি পর্যায়ে এলপিজি উৎপাদন না বাড়িয়ে পুরোপুরি বেসরকারি আমদানিনির্ভর ব্যবস্থার কারণে এলপি গ্যাসের বাজার কার্যত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ফলে দাম ও সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যেই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জানুয়ারি মাসের জন্য এলপি গ্যাসের নতুন দাম ঘোষণা করে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৫৩ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি অটোগ্যাসের দাম লিটারপ্রতি ২ টাকা ৪৮ পয়সা বাড়িয়ে ৫৯ টাকা ৮০ পয়সা করা হয়েছে। রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে এ দাম কার্যকর হয়।
তবে দাম ঘোষণার পরও বাজারে নির্ধারিত দামে এলপি গ্যাস পাওয়া যাবে—এ নিশ্চয়তা দিতে পারেননি বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। তিনি বলেন, কমিশন দাম নির্ধারণ করলেও ভোক্তা সেই দামেই গ্যাস কিনতে পারবে—এ নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় বিবেচনায় দাম নির্ধারণ করা হলেও বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
এলপিজি আমদানিতে জাহাজ সংকট, এলসি জটিলতা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহে সমস্যার কথাও তুলে ধরেন বিইআরসি চেয়ারম্যান। তিনি জানান, এসব কারণে কোম্পানিগুলোকে বিকল্প হিসেবে সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশে এলপিজির বার্ষিক ব্যবহার প্রায় ১৫ লাখ টনে পৌঁছালেও সরকারি উৎপাদন মাত্র ২০ হাজার টন। এর বড় অংশই একটি সরকারি বাহিনীকে সরবরাহ করা হয়। ফলে বাজার পুরোপুরি বেসরকারি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বর্তমানে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৭টি সক্রিয়ভাবে এলপিজি ব্যবসা করছে।
এ অবস্থায় বিভিন্ন জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। কেরানীগঞ্জে অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রির দায়ে পাঁচ ব্যবসায়ীকে ৩২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ফেনীতে একটি প্রতিষ্ঠানকে ১০ হাজার, রংপুরের তারাগঞ্জে দুটি প্রতিষ্ঠানকে ১১ হাজার, কুমিল্লায় দুটি প্রতিষ্ঠানকে ৮০ হাজার এবং মাগুরায় এক ডিলারকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
এ ছাড়া চাঁদপুর, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় অবৈধ মজুদ ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে একাধিক অভিযানে জরিমানা আরোপ করা হয়েছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, বাজারে দাম বৃদ্ধির পেছনে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট দায়ী। নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান বিশেষ সুবিধা পায়, অথচ তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের আশা, ধারাবাহিক অভিযানের ফলে দ্রুত এলপি গ্যাসের বাজার স্থিতিশীল হবে।