
দেশের ব্যাংক খাতের তদারকিতে সময়োপযোগী ও মৌলিক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য হচ্ছে তদারকি ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, কার্যকর ও আধুনিক করে তোলা, যাতে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি আগেভাগেই শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি বা ‘রিস্ক বেসড সুপারভিশন’ ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে নতুন তদারকি কাঠামোর বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের সব তফসিলি ব্যাংকে পর্যায়ক্রমে এই নতুন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে কয়েকটি ব্যাংকে পরীক্ষামূলকভাবে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। পরীক্ষামূলক এই প্রয়োগে ইতিবাচক ফল পাওয়ায় আগামী জুলাই থেকে ধাপে ধাপে সব তফসিলি ব্যাংকে এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন শুরু হবে। এরপর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৬ সালের শুরুতে এটি পুরোপুরি কার্যকর করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কাঠামোর মাধ্যমে প্রতিটি ব্যাংকের আর্থিক ঝুঁকি, বাজার ঝুঁকি, পরিচালনাগত ঝুঁকি, আইনগত ঝুঁকি এবং কৌশলগত ঝুঁকি আরও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এসব ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের জন্য প্রয়োজনীয় তদারকি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এতে করে প্রতিটি ব্যাংকের কার্যক্রম আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা সহজ হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে দ্রুত হস্তক্ষেপ করা যাবে।
নতুন এই তদারকি ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুনভাবে একাধিক তদারকি বিভাগ গঠন করবে। এর মধ্যে রয়েছে—তদারকি নীতিমালা ও সমন্বয় বিভাগ, তথ্য বিশ্লেষণ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং তদারকি বিভাগ এবং অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন রোধ সংক্রান্ত ঝুঁকি তদারকি বিভাগ। পাশাপাশি প্রতিটি তফসিলি ব্যাংকের জন্য পৃথক তদারকি দল গঠন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই সংস্কার সফল করতে তদারকির সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি তফসিলি ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের জন্যও আলাদা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এসব প্রশিক্ষণে আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাগুলো কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
তদারকি ব্যবস্থাকে আরও তথ্যনির্ভর করতে আধুনিক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। একটি কেন্দ্রীয় তদারকি তথ্য প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ চলছে, যার মাধ্যমে দেশের যে কোনো ব্যাংকের ঝুঁকির চিত্র সহজে বিশ্লেষণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, এই রূপান্তরের ফলে ব্যাংক খাতে জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে তদারকি কার্যক্রম হবে আরও কার্যকর ও প্রযুক্তিনির্ভর। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি আরও মজবুত হবে। এই দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব অংশীজনের সহযোগিতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ কামনা করেছে, যাতে একটি আধুনিক, ঝুঁকিসচেতন ও টেকসই ব্যাংকিং পরিবেশ গড়ে তোলা যায়।