
ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে নিকোলাস মাদুরো এক জটিল ও বিতর্কিত অধ্যায়—উত্থান যেমন নাটকীয়, পতন তেমনি হঠাৎ ও ভয়াবহ। ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো মানুষটি শেষ পর্যন্ত বন্দি হয়ে বিদেশি সামরিক শক্তির হাতে দেশ ছাড়বেন, এমন পরিণতি হয়তো তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অনুসারীরাও কল্পনা করেননি।
কারাকাসের শ্রমজীবী এক পরিবারে জন্ম নেওয়া মাদুরোর জীবন শুরু হয়েছিল সাধারণ মানুষের ভিড়েই। বাস চালানো ছিল তাঁর জীবিকার অংশ, রাজনীতি তখনো দূরের কোনো স্বপ্ন। কিন্তু সময়ের স্রোতে মানুষ বদলায়, স্বপ্নও রূপ নেয় সংগ্রামে। ১৯৯২ সালে সেনা কর্মকর্তা হুগো শ্যাভেজ যখন ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর কারাগারে বন্দি, তখন নিকোলাস মাদুরো ছিলেন রাস্তায় নামা এক কর্মী—শ্যাভেজের মুক্তির দাবিতে স্লোগান তোলা কণ্ঠগুলোর একটি। সেখান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের বীজ রোপিত হয়।
শ্যাভেজ মুক্তি পাওয়ার পর সমাজতন্ত্রের যে পতাকা তিনি তুলে ধরেন, মাদুরো তাতে নিঃশর্ত সমর্থন জানান। ১৯৯৮ সালে পার্লামেন্টে প্রবেশের মাধ্যমে তাঁর উত্থান শুরু। ধীরে ধীরে ক্ষমতার অলিন্দ পেরিয়ে তিনি হলেন স্পিকার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পরে ভাইস প্রেসিডেন্ট। শ্যাভেজের মৃত্যুতে যেন ভাগ্যের দরজা সম্পূর্ণ খুলে যায়—২০১৩ সালে মাদুরো হন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট।
কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার পর তাঁর শাসন আর স্বপ্নময় থাকেনি। তেলসমৃদ্ধ দেশটি অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত হতে থাকে। মুদ্রার অবমূল্যায়ন, দ্রব্যমূল্যের উল্লম্ফন আর দীর্ঘ সারির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ—এসবই হয়ে ওঠে মাদুরোর শাসনের প্রতীক। নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ, বিরোধীদের দমন, রাস্তায় রক্তাক্ত বিক্ষোভ—২০১৪ ও ২০১৭ সালে দেশ কেঁপে ওঠে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁকে আখ্যা দেওয়া হয় স্বৈরশাসক হিসেবে।
তবু ক্ষমতার মোহ ছাড়েননি মাদুরো। ২০২৪ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্টের শপথ নেন তিনি। কিন্তু সেই শপথের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল পতনের বীজ। জনগণের ক্ষোভ তখন আর চাপা ছিল না। রাজপথে নেমে আসে বিক্ষুব্ধ জনতা, দাবি ওঠে—এই ফলাফল মানা যায় না।
এরই মধ্যে ক্ষমতায় ফিরে আসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেন। মাদক পাচার, গ্যাং সহিংসতা, তরুণ সমাজ ধ্বংসের অভিযোগে সরাসরি মাদুরোর নাম উচ্চারিত হয়। কূটনৈতিক চাপ ক্রমেই রূপ নেয় সামরিক তৎপরতায়।
অবশেষে ইতিহাসের সেই ভয়াবহ সকাল। ভোরের অন্ধকারে কারাকাসে নেমে আসে বিদেশি সামরিক শক্তি। আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে বন্দি করা হয় নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে। ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পের ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্ব জানতে পারে—১৯৮৯ সালের পানামার পর আবারও লাতিন আমেরিকার এক দেশে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ।
বাসচালক থেকে প্রেসিডেন্ট, আর প্রেসিডেন্ট থেকে বন্দি—নিকোলাস মাদুরোর জীবন যেন ক্ষমতার এক নির্মম উপকথা। যেখানে আদর্শ দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে স্বপ্নভঙ্গ, দমন-পীড়ন আর এক স্বৈরশাসকের পতনের প্রতীক হিসেবে।