
বাংলাদেশের সংগীতভুবনে যে কণ্ঠগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গভীর হয়ে ওঠে, ফাহমিদা নবী তাঁদের অন্যতম। ১৯৬৬ সালের ৪ জানুয়ারি দিনাজপুর জেলায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পী ছোটবেলা থেকেই বেড়ে উঠেছেন সংগীতের পরিবেশে। তাঁর পরিবারেই গান ছিল দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে ফাহমিদা নবীর কণ্ঠে যে সংযত আবেগ, শালীনতা ও মানবিকতা শোনা যায়, তার শিকড় গেঁথে আছে পারিবারিক ঐতিহ্যে।
ফাহমিদা নবীর পিতা মাহমুদুন নবী ছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত প্লেব্যাক ও আধুনিক গানের শিল্পী। তাঁর কণ্ঠের কোমলতা ও আবেগময় উপস্থাপন একসময় বাংলা চলচ্চিত্র ও আধুনিক গানে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। ১৯৭৬ সালে ‘দ্য রেইন’ চলচ্চিত্রের জন্য সেরা পুরুষ প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। ১৯৯০ সালে তাঁর মৃত্যুর পরও মাহমুদুন নবীর গান শ্রোতাদের মনে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে আছে। ফাহমিদা নবী নিজেও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, তাঁর বাবাই ছিলেন জীবনের প্রথম ও সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তিনি শুধু গান শেখাননি, শিখিয়েছেন মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ।
১৯৭৯ সালে ফাহমিদা নবীর সংগীতজীবনের সূচনা। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আধুনিক গানে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেন। পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নজরুলগীতিতেও তাঁর কণ্ঠ শ্রোতাদের কাছে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা পায়। তাঁর গানে অতিরঞ্জিত আবেগের বদলে থাকে সংযত অনুভব, যা শ্রোতাকে নীরবে স্পর্শ করে। এই বৈশিষ্ট্যই তাঁকে সমসাময়িক অনেক শিল্পীর ভিড় থেকে আলাদা করেছে।
চলচ্চিত্রের গানে তাঁর অবদানও উল্লেখযোগ্য। ২০০৭ সালে ‘লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প’ গানটির জন্য তিনি সেরা নারী প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এই স্বীকৃতি তাঁর দীর্ঘদিনের সংগীত সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। পাশাপাশি তিনি মঞ্চগান ও অ্যালবামেও সক্রিয় থেকেছেন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতার সঙ্গে নিজের সংযোগ বজায় রেখেছেন।
ফাহমিদা নবীর পরিবারেও সংগীতচর্চার ধারাবাহিকতা রয়েছে। তাঁর বোন সামিনা চৌধুরি এবং ভাই পঞ্চম—দুজনেই সংগীতের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ফাহমিদা নবীর শিল্পীসত্তা কেবল ব্যক্তিগত প্রতিভার ফল নয়, বরং একটি সংগীতমগ্ন পরিবারের সম্মিলিত উত্তরাধিকার।
আজ তাঁর জন্মদিনে ফাহমিদা নবীকে ঘিরে শ্রোতাদের আবেগ শুধু একজন শিল্পীর প্রতি ভালোবাসা নয়, বরং একটি সময়, একটি সুর ও একটি মানবিক ধারার প্রতি শ্রদ্ধা। তাঁর কণ্ঠে এখনো শোনা যায় বাবার শেখানো সেই নীরব সুর, যা কথা না বলেও অনুভূতি প্রকাশ করতে জানে। ফাহমিদা নবী আজও প্রমাণ করে চলেছেন, গান শুধু বিনোদন নয়—গান হতে পারে মানুষের ভেতরের আলো জ্বালানোর ভাষা।