
লাতিন আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে স্ত্রীসহ আটক করার ঘটনা হঠাৎ ঘটলেও এর পেছনে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই অভিযানের প্রেক্ষাপটে দেশটির বিরোধীদলীয় নেত্রী ও শান্তিতে নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র কয়েক মাস ধরেই ভেনেজুয়েলার আশপাশের জলসীমায় রণতরী ও সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছিল। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তবে নোবেলজয়ী এই নেত্রী নিজ দেশেই সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন।
প্রেসিডেন্ট মাদুরো আটক হওয়ার পর শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে মাচাদো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার অঙ্গীকার পূরণ করেছে। তাঁর ভাষায়, মাদুরোকে এখন ভেনেজুয়েলার জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত ‘ভয়ংকর অপরাধের’ জন্য আন্তর্জাতিক বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তিনি এটিকে ‘স্বাধীনতার সময়’ হিসেবেও বর্ণনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জন্য পরিচিত মাচাদো। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, গাজায় দীর্ঘ সময় ধরে সহিংসতা চললেও তিনি এ বিষয়ে কোনো প্রকাশ্য অবস্থান নেননি, যা তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও সমালোচনা উঠেছে।
মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার মার্কিন সেনারা প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান। পরে নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের অ্যাটর্নি জেনারেল তাদের বিরুদ্ধে মাদক ও সন্ত্রাস সংশ্লিষ্ট ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনেন।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে মাচাদো সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযানের আহ্বান জানান। তিনি দাবি করেন, মাদুরো ভেনেজুয়েলার জনগণের বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এমনকি তিনি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের যোগ্য বলেও উল্লেখ করেছিলেন।
এই আহ্বানের পর থেকেই ক্যারিবীয় সাগরে ভেনেজুয়েলার নৌযান লক্ষ্য করে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের হিসাবে, এসব হামলায় অন্তত শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। সর্বশেষ অভিযানের মাধ্যমেই মাদুরোকে আটক করা হয়।
মাদুরোর পতনের পর ভেনেজুয়েলার পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র মাচাদোকেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চাইছে। ট্রাম্প নিজেও ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাচাদোর প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১৯৮৯ সালের পর লাতিন আমেরিকায় এটি প্রথম সরাসরি মার্কিন সামরিক আগ্রাসন। সে বছর পানামায় হস্তক্ষেপ করে মানুয়েল নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল।
২০১৩ সালে হুগো শ্যাভেজের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন নিকোলাস মাদুরো। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক অবরোধে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এ কারণে মাদুরোর পতনে দেশটির রাজপথে বড় ধরনের প্রতিরোধ নাও হতে পারে বলে ধারণা করছেন পর্যবেক্ষকেরা। তবে মাচাদোর নেতৃত্ব ভেনেজুয়েলার জনগণ কতটা গ্রহণ করবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।