
পৌষ মাস শুরু হতেই দেশজুড়ে শীতের তীব্রতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। দিনের বড় অংশজুড়ে সূর্যের দেখা মিলছে না, চারদিকে ঘন কুয়াশা ও ঠান্ডা বাতাসের প্রভাব স্পষ্ট। এর ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হতে চাইছেন না, সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা।
শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে ঠান্ডাজনিত রোগীর চাপও বাড়ছে। সর্দি-কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চিকিৎসকেরা সবাইকে পর্যাপ্ত গরম পোশাক ব্যবহারের পাশাপাশি পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণির মানুষদের বাড়তি সতর্ক থাকতে বলা হচ্ছে।
ঘন কুয়াশার কারণে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাও নিয়মিত ব্যাহত হচ্ছে। বিমান চলাচল, নৌপথ, সড়ক ও রেলপথে সৃষ্টি হচ্ছে বিঘ্ন। রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রানওয়ের দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় শুক্রবার রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ে অবতরণ করতে পারেনি, ফলে ফ্লাইট বিলম্বিত হয়।
শীতের প্রভাব পড়েছে কৃষি ও অর্থনীতিতেও। কৃষক ও খামারিরা ফসলের ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন। অনেক এলাকায় ইরি ধানের বীজতলা ঠান্ডায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার এক কৃষক জানান, প্রচণ্ড শীতে অনেক চারা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সামনে রোপণ মৌসুমে সংকট তৈরি হতে পারে। শীতের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যেও মন্দাভাব দেখা দিয়েছে; অনেক দোকানপাট নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, দেশে শীতের সময়কাল আগের তুলনায় কিছুটা কমলেও এর তীব্রতা বেড়েছে। সাধারণত বৃষ্টির মাধ্যমে কুয়াশা কেটে গেলেও বর্তমানে বায়ুদূষণের কারণে কুয়াশার স্থায়িত্ব বেড়েছে। নিকট ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টির সম্ভাবনাও খুব কম বলে জানানো হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক ও আবহাওয়াবিদ মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, ঘন কুয়াশা ও সূর্যের আলো না পাওয়ার কারণেই শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে। জানুড়ি মাসজুড়ে এই পরিস্থিতি বিরতিহীনভাবে চলতে পারে—মাঝে কিছুটা কমলেও আবার বাড়বে।
আরেক আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ জানান, দেশের শীতের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘন কুয়াশার প্রবণতা বেড়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় যে মাত্রার শীত অনুভূত হয়েছে, তা গত দুই দশকে বিরল। সেদিন রাজধানীর তাপমাত্রা নেমে আসে ১৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যেখানে কয়েক দিন আগেই তা ছিল প্রায় ২৮–২৯ ডিগ্রি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে দেশে ৪ থেকে ৫টি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে দুই থেকে তিনটি মাঝারি এবং অন্তত একটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে রাজশাহী, পাবনা, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।
উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামে তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। সূর্যের দেখা না মেলায় সেখানে শীতের অনুভূতি আরও তীব্র। একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে পঞ্চগড়, জয়পুরহাট ও বরিশালেও। পঞ্চগড়ে শীতার্তদের মধ্যে কম্বল বিতরণসহ সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে, পৌষের শুরুতেই শীতের এই অস্বাভাবিক তীব্রতা জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, জানুয়ারিতে শৈত্যপ্রবাহের সংখ্যা বাড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।