ইরানকে কেন্দ্র করে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের মধ্যে কৌশলগত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (৭ মার্চ) সকালে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা জানায়, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান আল সৌদ এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান আসিম মুনির জরুরি বৈঠক করেন।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানানো হয়েছে, বৈঠকে মূলত ‘সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইরানের আগ্রাসন’ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এটি দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের মধ্যে বিদ্যমান কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তির কাঠামোর আওতায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে উভয় পক্ষ আশা প্রকাশ করেছে যে, ইরান বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে এবং কোনো ভুল হিসাব-নিকাশ থেকে বিরত থাকবে।
এর আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে পাকিস্তানকে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতে জড়াতে হতে পারে। এই চুক্তি গত বছর ১৭ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ‘যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ শক্তিশালী করা’।
চুক্তি স্বাক্ষরের সময় উভয় দেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিল। বিশেষভাবে কাতারের রাজধানীতে ইসরায়েলের হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় এই প্রতিরক্ষা চুক্তি আরও গুরুত্ব পেয়েছিল।
ইরান এবং পাকিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে জটিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র করেছিল। বর্তমানে ইসলামাবাদকে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে নাকি সামরিকভাবে জড়িত হতে হবে—সেটি এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সৌদি-পাকিস্তান বৈঠকের প্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে ইরানের হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ এবং পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বৈঠক দুই দেশের যৌথ প্রতিরক্ষা নীতি আরও দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে নেওয়া পদক্ষেপ হিসাবেও দেখা হচ্ছে।
উভয় দেশের প্রতিনিধি বৈঠকে ইরানকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে এগোতে আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি আঞ্চলিক সংঘাতের যে কোনো প্রভাব যাতে সমালোচনামূলক পর্যায়ে পৌঁছায়, তা নিয়ন্ত্রণে রাখারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরব এবং পাকিস্তান উভয়ই আশা প্রকাশ করেছে যে, ইরানের সঙ্গে যুক্তি, সংলাপ এবং বিচক্ষণতা বজায় রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈঠকটি শুধু সামরিক সমন্বয়ই নয়, কূটনৈতিক বার্তা হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান যদি ইরান-সৌদি সংঘাতে জড়িত হয়, তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আর সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি পাকিস্তানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংক্ষেপে, ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে সৌদি-পাকিস্তান জরুরি বৈঠক রাজনৈতিক ও সামরিক দুই দিকের প্রভাবই প্রতিফলিত করছে। উভয় দেশই আশা প্রকাশ করেছে যে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে ইরান যুক্তি ও বিচক্ষণতার পথে এগোবে এবং কোনো ভুল হিসাব-নিকাশের সুযোগ তৈরি হবে না। বৈঠকের ফলাফল আগামীদিনে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
কসমিক ডেস্ক